শিশুর পেটে মাদক, বিবেক কোথায়?

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৩০

নেলসন ম্যান্ডেলা বলিয়াছেন, একটি সমাজের আত্মা কেমন, তাহা সর্বাপেক্ষা ভালো বোঝা যায় সেই সমাজ তাহার শিশুদের সহিত কেমন আচরণ করে, তাহা দেখিলে । কথাটি আজ আমাদের জন্য নিছক একটি উদ্ধৃতি নহে, বরং আত্মজিজ্ঞাসার এক নির্মম আয়না। কারণ, যে সমাজের শিশুরা স্কুল ব্যাগের পরিবর্তে মাদক বহন করে, সেই সমাজের আত্মা কোন নিকষ অন্ধকারে নিমজ্জিত, তাহা অনুমান করা কঠিন নহে। সম্প্রতি চট্টগ্রামে পেটের ভিতর ইয়াবা বহন করিয়া পাচারের সময় ৯ ও ১২ বৎসর বয়সি দুই শিশুকে হেফাজতে নেওয়া হইয়াছে। তাহাদের পেট হইতে উদ্ধার করা হইয়াছে প্রায় ৭ হাজার ইয়াবা। অর্থের প্রলোভন দেখাইয়া একটি চক্র এই সকল কোমলমতি শিশুকে ব্যবহার করিয়াছে। যেই বয়সে তাহাদের বিদ্যালয়ে থাকিবার কথা, সেই বয়সে তাহাদের শরীরকেই বানানো হইয়াছে মাদক পাচারের বাহন! ইহার চাইতে নির্মমভাবে একটি শিশুর শৈশবকে আর কীভাবে অপমান করা যায়?

ইহা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নহে । মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গবেষণায় উঠিয়া আসিয়াছে, দেশে মাদক পরিবহন ও বিক্রয়ের সহিত জড়িতদের প্রায় ২৫ শতাংশই শিশু, যাহাদের অধিকাংশের বয়স ১৬ বৎসরের নিচে। আরেক গবেষণায় দেখা যায়, পথশিশুদের ২১ শতাংশকে মাদকের বাহক হিসাবে ব্যবহার করা হয় । দেশব্যাপী ১ হাজার ৬০০ পথশিশুর উপর পরিচালিত ঐ গবেষণায় ৫৮ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো মাদক গ্রহণের কথাও জানিয়াছিল । সাম্প্রতিক আরেক গবেষণায় রাজধানী ঢাকায় ১৫ বৎসর বা তাহার কম বয়সি শিশুদের মাদক বিক্রির সহিত উল্লেখযোগ্য সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া গিয়াছে। এই সকল পরিসংখ্যান চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দেয়, মাদক ব্যবসার বিস্তার আমাদের শিশুদের ভবিষ্যতের উপরও সরাসরি নির্মম আঘাত ।

উন্নত বিশ্বও এই বিপদের বাহিরে নাই । তবে তাহারা বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখিয়া থাকেন । সেই সকল দেশে শিশুরা অপরাধে জড়াইয়া পড়িলে কেবল সেই অপরাধের বিচারই করা হয় না, কে বা কাহারা তাহাকে ব্যবহার করিল, কীভাবে করিল এবং কেন সে অপরাধীদের নিকট অসহায় আত্মসমর্পণ করিল, সেই প্রশ্নগুলিও গুরুত্বের সহিত অনুসন্ধান করা হয় । সমস্যাটিকে সেইখানে কেবল ‘শিশুর অপরাধ' হিসাবে দেখা হয় না। বরং দেখা হয় 'চাইল্ড ক্রিমিনাল এক্সপ্লোয়িটেশন’ বা শিশুদের ‘অপরাধে শোষণের শিকার' হিসাবে। ইহার পাশাপাশি পুলিশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমাজসেবা সংস্থার সমন্বয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের শনাক্ত ও সুরক্ষার ব্যবস্থাও করা হয় । আন্তর্জাতিক আইনও এই ক্ষেত্রে অধিক শক্ত । জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ৩৩ নম্বর অনুচ্ছেদে শিশুদের মাদকদ্রব্যের অবৈধ ব্যবহার এবং মাদক উৎপাদন ও পাচারে ব্যবহারের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করিবার কথা বলা হইয়াছে। অর্থাৎ শিশুকে অপরাধের হাতিয়ার বানানো কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নহে, ইহা শিশুর মৌলিক অধিকারেরও সরাসরি লঙ্ঘন। অতএব, শিশুদের যাহারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করে, সেই সকল অমানুষের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করিবার পাশাপাশি কোন এলাকায়, কোন পরিবারে, কোন পরিস্থিতিতে শিশুরা অপরাধী চক্রের সহজ শিকারে পরিণত হইতেছে, উহাও শনাক্ত করিতে হইবে।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, “তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার- পরিজনকে আগুন হইতে রক্ষা করো ।' অথচ যাহাদের রক্ষা করার কথা, তাহাদেরই আমরা কখনো দারিদ্র্যের সুযোগে, কখনো লোভ দেখাইয়া, কখনো-বা অপরাধী চক্রের কৌশলে অগ্নিগর্ভের মধ্যে ঠেলিয়া দিতেছি । ইহা সত্যিই মানবিকতার চরম পরাজয় । মনে রাখিতে হইবে, শিশুর ছোট্ট পেট মাদক বহনের পাত্র নহে, উহা ভবিষ্যতের স্বপ্ন ধারণের স্থান । সেই স্বপ্নের ভিতর মাদক ঢুকাইয়া দেওয়া মানে শুধু একটি শিশুর শৈশব কাড়িয়া লওয়া নহে, বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎকেই অন্ধকারের হাতে তুলিয়া দেওয়া । যে সমাজ নিষ্পাপ-অবুঝ শিশুদের ব্যবহার করিয়া এহেন জঘন্য অপকর্ম করিতে পারে, সেই সমাজের আত্মা নিশ্চিতভাবে অসুস্থ ও কলুষিত । উইলি ব্রান্ট যেমনটি বলিয়াছেন, “শিশুদের প্রতি করা প্রতিটি অন্যায় সমগ্র মানবতার জন্যই একটি কলঙ্ক।’

ইত্তেফাক/এনএন