সুষ্ঠু নির্বাচন পারস্পরিক আস্থার ফল

১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের মূল শ্লোগান ছিল, “গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক”। এরপর থেকে বাংলাদেশে বিগত প্রায় তিন দশক ধরে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে বাংলাদেশের জনগণ। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল তারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুধু সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল তার দায়িত্ব শেষ করে দেয়নি, দেশ ও জাতির প্রতি দায়িত্ববোধ ও গণতান্ত্রিক ধারাকে অব্যাহত রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাতে তৃতীয় কোনো শক্তি আসতে না পারে সেজন্য সংবিধানও সংশোধন করা হয়েছে। কারণ সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশে দু’বছর শাসনকার্য পরিচালনা করেছিল। সরকার শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাই বাতিল করেনি, সঙ্গে সঙ্গে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে ‘ক্রেডিবল’ নির্বাচন হয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়, সে উদ্দেশ্যে কাজ করে যাচ্ছে। দেশীয় পর্যবেক্ষক দল ছাড়াও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক দল নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবে। নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর ৮০ এর দশকে। এমনকি ১৯৭০ এর নির্বাচনেও কোনো পর্যবেক্ষক ছিল না, তবে বিদেশি সাংবাদিক ছিল। তদানীন্তন দূতাবাসগুলোর প্রেস সেকশন কাজ করেছে। সুতরাং নির্বাচন যদি ক্রেডিবল হয়, তবে খুব বেশি বিদেশি পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয় না।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে মনোনয়ন প্রাপ্তি পর্যন্ত পূর্ণ চিত্রটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সংসদ নির্বাচন শুধু সকল দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণই নিশ্চিত করে নি, প্রকারান্তরে এই চিত্রটাও সামনে আসে যে, তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে মনোনয়ন প্রাপ্তি পর্যন্ত এই পূর্ণ প্রক্রিয়ার কোথাও নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের গুরুতর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এটা দেশের একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থাকেই তুলে ধরে। কতজন মনোনয়ন জমা দিয়েছেন সেই প্রসঙ্গে নাইবা গেলাম। মনোনয়ন দাখিলকারী ৩০৬৫ জন প্রার্থীর মধ্যে ৭৮৬ জনের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। সাধারণত ঋণখেলাপি, আদালতে সাজাপ্রাপ্ত এবং হলফনামায় কোনো ভুল তথ্য থাকলে প্রার্থিতা বাতিল হয়। ৭৮৬ জন প্রার্থী নির্বাচন কমিশনে আপিল করতে পারবেন ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত এবং আপিলের শুনানি হবে ৬, ৭ ও ৮ ডিসেম্বর। প্রার্থীরা শুনানিতে আশ্বস্ত না হলে আদালতের আশ্রয় নিতে পারবেন।

ঐক্যফ্রন্ট, প্রধানত বিএনপি-এর পক্ষ থেকে বারবার লেভেল প্লেইং ফিল্ড-এর দাবি আসছে। আর এই দাবি বিএনপি বিগত ৫ বছর ধরেই করে যাচ্ছে। এটা বিএনপির একটি রাজনৈতিক কৌশল। এই কৌশল বিএনপি নিতেই পারে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা হলো সরকারের লাভজনক পদে যারা আছে, তারা কোনো নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না, কারণ এতে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আছে। অন্যদিকে, ঐক্যজোট এবং বিএনপি-র কেন্দ্রীয় নেতা থেকে শুরু করে মাঠের কর্মী, সবাই নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করতে পারবে। লেভেল প্লেইং ফিল্ড-এর ক্ষেত্রে একটা বিষয় বোধ হয় রাজনৈতিক দলগুলোর সচেতনভাবে বুঝে নেওয়া দরকার যে, এই লেভেল প্লেইং ফিল্ড শুধু নির্বাচনের সময় দাবি করলেই চলবে না, নির্বাচন-উত্তর সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দল উভয় দলকেই সমানভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। অতীতে বছরের পর বছর ধরে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। রাষ্ট্রের প্রতি সরকারি ও বিরোধী দল উভয়েরই সমান দায়িত্ব। সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করে আর বিরোধী দল সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করে সরকারকে সঠিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে সাহায্য করে। এই লেভেল প্লেইং ফিল্ড সকলের ক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে হবে। সংখ্যালঘু নৃ-গোষ্ঠী, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী বিশেষত নারীরা যাতে লেভেল প্লেইং ফিল্ড-এর সুযোগ পায় সেটা দায়িত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। ২০২০ সালের মধ্যে শতকরা ৩৩ ভাগ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে। আশা করা যায়, পরবর্তী সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই লেভেল প্লেইং ফিল্ড-এর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিবে। তাহলেই বাংলাদেশে একটা স্থায়ী, টেকসই লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি হবে।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার আসবে ১৫ ডিসেম্বর। শোনা যাচ্ছে যে, গ্রামীণ উন্নয়ন ও তরুণদের উন্নয়ন প্রাধান্য পাবে। গ্রামীণ উন্নয়ন ও তরুণদের উন্নয়ন সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের উন্নয়নকে নিশ্চিত করবে। বাংলাদেশে এখনো শতকরা ৭৫ ভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে জীবিকার জন্য কৃষির উপর নির্ভরশীল। কৃষিকে যদি শিল্পে রূপান্তর করা যায়, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশ উন্নয়নের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিবে। বাংলাদেশে এখন বৃদ্ধ ও শিশুদের তুলনায় তরুণ বা যুবক বেশি, আর এই তারুণ্যকে যদি মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা যায় এবং উন্নয়নে ব্যবহার করা যায়, তবে বাংলাদেশের জন্য তারাই হবে সব থেকে বড় সম্পদ। শিক্ষা হলো মানবসম্পদ গড়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম। বর্তমান সরকার ইতোমধ্যেই অঙ্গীকার করেছে, দেশের প্রতিটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। আর এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু মানবসম্পদই তৈরি করবে না, উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য বিশেষজ্ঞ তৈরি করবে, যা বাংলাদেশে স্থিতিশীল ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করবে। বাংলাদেশের তারুণ্যের ইতিহাস অসম্ভব গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস; এটা আমরা সকলেই জানি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ— সবকিছুতেই তরুণরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তারা যেকোনো বৃহত্তর সমস্যার সমাধানে পথ দেখাতে পারে।

সুষ্ঠু নির্বাচন পারস্পরিক আস্থার ফল। বাংলাদেশে এখন সুস্থ নির্বাচনের পরিবেশ বিরাজমান। ঐক্যফ্রন্ট যখন গঠন হলো, তখন মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির আবির্ভাব হয়েছে। এরপর নেতৃত্বশূন্য বিএনপিও ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিল। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২৫ জন সক্রিয় জামায়াতপন্থিও ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছে। অর্থাত্ দেশে এখন মোটা দাগে দুইটি রাজনৈতিক ধারা: একটি স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি, অন্যটি স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি। বৈশ্বিক রাজনীতিতেও এটা খুব ব্যাতিক্রম নয়; বরং এটাই প্রচলিত প্রথাতে পরিণত হয়েছে। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে দুইটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের মধ্যেই নির্বাচনী ও সরকার গঠনের প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে। এমনকি এশিয়ার মধ্যেও উন্নত রাষ্ট্র জাপানে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে দুইটি রাজনৈতিক দলই বিরাজমান। এবারের নির্বাচন দেশ ও জাতির জন্য অনেক গুরুত্ব ও তাত্পর্যপূর্ণ। কারণ, আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্ণ হবে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০০তম জন্মবার্ষিকীও আসবে। স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগ বিশেষত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় জীবনের এই দুইটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস হূদয়ের অন্তঃস্থল থেকে সমগ্র জাতিকে সঙ্গে নিয়ে যেভাবে পালন করবেন সেটা অন্য আর কারো কাছ থেকেই আশা করা যায় না।

n  লেখক:  অধ্যাপক ও ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া