মনোযোগী ও কর্মঠ হওয়ার বিকল্প নেই

আমার মাঝেমধ্যে কষ্ট হয় এই ভেবে যে, আমি যা যেভাবে চেয়েছি- তা সেভাবে পাইনি। আমি হয়তো চেয়েছি ডাক্তার হতে; হয়ে গেছি আইনজীবী। কিংবা সাংবাদিক হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও হয়ে গেছি শিক্ষক। ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন সেই ছোটকাল থেকে দেখে আসলেও; আজকের দিনে আমাকে হতে হয়েছে অর্থনীতির শিক্ষার্থী। আমি মানসিকভাবে ভালো থাকছি না; আমার আফসোস হয়, কষ্ট হয়।

এ ধরনের চিন্তাগুলো মোটামুটি আমরা সবাই করি। যদি এককথায় বলি—শুধু আমাদের নিজের মন মতো হয়নি বলে আমাদের যত কষ্ট! আবার, এটাও সত্য যে- সবকিছু সৃষ্টির তথা আমাদের মন মতো হবে না এবং ‘সময়’ বলে কিছু একটা আছে। তবুও আমরা নাখোশ হই।

আচ্ছা, আমি আপনি যে পথে চলছি- সে পথের ব্যাপারে কী আমার-আপনার পূর্ব ধারণা ছিল? বা থাকলেও সেটা কী আমি-আপনি স্মরণ করতে পারছি? পারছি না। জীবনে চলার পথটা কারও চেনা-জানা থাকে না। আপনার বয়স এখন ২০ বছর; আগামী ১০ দিনে আপনার অবস্থাটা কী হবে- সেটা নিয়ে আপনি কী নিশ্চিত? হয়ত আপনার পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থানের কারণে আপনার মনে হতে পারে যে, ভালো কিছুই হবে; কিন্তু আপনি আদৌ সে বিষয়ে নিশ্চিত থাকতে পারেন না এবং এটাই সত্য। যেকোনো সময় যেকারোর সঙ্গেই যেকোনো কিছু ঘটতে পারে; ভালো-মন্দ তো পরের বিষয়। সেজন্য আপনাকে সব সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আর যেকোনো পরিস্থিতি মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতেই হবে।

তাহলে এখন কী করা! আমরা কী স্বপ্ন দেখবো না? ভালো কিছু চাইবো না? অবশ্যই আমরা স্বপ্ন দেখবো এবং ভালো কিছুর প্রত্যাশা সবসময় করবো। সবকিছুর ঊর্ধ্বে যে বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে সেটি হলো:কী হবে না হবে - তা চিন্তাও করা যাবে না, শুধুমাত্র কাজের প্রতি মনোযোগী থাকতে হবে।

কোনো কাজে সফল হওয়াটা সব সময় জরুরি না, কখনও কখনও পরাজিত হতে হয়; পরাজিত হওয়ার আড়ালে মহত্ ও বিশাল কোনো উদ্দেশ্য থাকতেও পারে। বিদ্যুতের আবিষ্কারক মাইকেল ফ্যারাডের কী দরকার ছিল যে, উনি নিজে বিদ্যুতায়িত হয়ে মারা যাবেন! কিংবা পড়ে গেলে নির্ঘাত মৃত্যু জেনেও ঠিক কোন কারণে এভারেস্ট জয় করতে গিয়ে হাজারো মানুষ মৃত লাশ হয়েছে!

ফ্যারাডের মৃত্যু আগামী পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য আশীর্বাদ ছিল; বিদ্যুত্ যে মানুষের জীবন নিতে পারে- এ বিষয়ে মানুষের মধ্যে একটা বোধ তৈরি করেছিল ফ্যারাডের মৃত্যুবরণ।

জীবন মানেই প্রতিযোগিতা। এখানেও হার-জিত আছে। সবসময় জয় পেতেই হবে, এমনটা না-ও হতে পারে। প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়েও যে বড় ধরনের ম্যাসেজ সবার কাছে সবসময়ের জন্য পৌঁছে দেওয়া যায়, তার বাস্তব উদাহরণ আরও হাজারটা থাকতে পারে। তবে, আমার কাছে সাবেক ব্রিটিশ দৌড়বিদ ডেরেক রেমন্ড-এর গল্পটা অনেক বেশি কার্যকর মনে হয়।

১৯৯২ সালে বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত অলিম্পিক গেমস্-এ ৪০০ মিটার স্প্রিন্টে সেমিফাইনালে উঠেছিলেন ডেরেক রেমন্ড। ফাইনালে স্বর্ণপদক জয়ের বিবেচনায় এগিয়ে ছিলেন তিনি। ফাইনাল দৌড় শুরু হলো। ডেরেক দৌড় শুরু করলেন। ১ম ১৫০ মিটার ভালোভাবেই শেষ করলেন ডেরেক, কিন্তু শেষ ২৫০ মিটারেই বাঁধল বিপত্তি! তখন তার হ্যামিস্ট্রিংয়ে ব্যথা শুরু হয়ে গিয়েছিল। দ্রুতবেগে দৌড়ানো মানুষটা ব্যথায় কাতর হয়ে একসময় বসে পড়লেন। একটু পর আবার উঠে দাঁড়ালেন এবং ব্যথা নিয়েই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দৌড়াতে লাগলেন। এদিকে তার পিতা জিম নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেদ করে ট্র্যাকে চলে আসলেন; জিম চেয়েছিলেন ছেলে ডেরেককে দৌড় থেকে বিরত রাখতে, কিন্তু ডেরেক ছেড়ে দেবার পাত্র নন। তিনি বাকি ২৫০ মিটার পথ শেষ করতে চেয়েছিলেন। এবার পিতা-পুত্র একসঙ্গে ট্র্যাক ধরে হেঁটে চলছেন। শেষমেষ ফিনিশিং লাইনের আগে পিতা তার ছেলেকে একা ছেড়ে দেন। ডেরেক ৪০০ মিটার পথ শেষ করেন।

সেদিন ডেরেক কোনো স্বর্ণপদক পাননি। কিন্তু, তার চলার পথ বা গন্তব্যের পথে অবিচল থাকার যে নজীর তিনি স্থাপন করে গেছেন; শেষ পর্যন্ত হাল না ছেড়ে নিজের কাজটা করে যাওয়ার যে সামর্থ্যটা তিনি দেখিয়ে গেছেন; তা আদৌ কেউ হাজারটা স্বর্ণপদক জয়ের মাধ্যমেও দেখিয়ে যেতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। সেদিন স্বর্ণপদক জয়ী মানুষটাও এতো এতো করতালি পায়নি, পরাজিত হয়ে যতটা ডেরেক পেয়েছিল। সেদিনের জয়টা ডেরেকেরই ছিল।

মানুষ চাইলেই সব পারে। শুধু মানুষই এমন। তবে হ্যাঁ, কেউ কেউ হয়ত দু’দিন আগে পারে- আর কেউ কেউ পারে ১০ দিন পরে। কাজেই কোনো পরিস্থিতিই যেন আমাদেরকে কখনও হতাশ না করে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়