এই সমাজ সুষ্ঠু-স্থিতিশীল-ন্যায়ভিত্তিক কী করিয়া হইবে?

আভিধানিকভাবে 'ডেভিল' শব্দটির অর্থ শয়তান-যাহা মন্দ, দুষ্ট বা ধ্বংসাত্মক শক্তির প্রতিরূপ হিসাবে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিতে পরিচিত। ইহা ছাড়াও, ইহার অন্যান্য অর্থ হইল-অশুভ শক্তি, দুষ্ট বা চতুর ব্যক্তি। অতএব রাষ্ট্র যখন কোনো বিশেষ অভিযানের নামকরণে 'ডেভিল' শব্দটি ব্যবহার করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সমাজের মনে প্রত্যাশা জন্মে-এই অভিযানের লক্ষ্য হইবে প্রকৃত অপরাধ, প্রকৃত হিংসা ও প্রকৃত ধ্বংসাত্মক শক্তিকে হান্ট তথা শিকার করা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইত্তেফাক ও পত্রিকান্তরে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে যেই চিত্র উদ্ভাসিত হইয়াছে, তাহা রাষ্ট্রের এই প্রত্যাশার সহিত ক্রমশ বিরোধ সৃষ্টি করিতেছে। নির্বাচনকে সুষ্ঠু করিবার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অপরাধীদের অবশ্যই গ্রেফতার করিবে। কিন্তু ডেভিল হান্টের নামে বিশেষ অভিযানে যেই বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রেফতার হইতেছে, তাহাদের বড় অংশই যে পেশাদার অপরাধী বা চিহ্নিত সন্ত্রাসী নহে-এই বাস্তবতা উপেক্ষা করিবার উপায় নাই। বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলিতেছে, দুই দফার বিশেষ অভিযানে এবং পরবর্তী মামলাসূত্রে মোট গ্রেফতারের সংখ্যা ৮০ হাজার অতিক্রম করিলেও, উদ্ধারকৃত অস্ত্রের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে নগণ্য।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে রাষ্ট্র যে আইনি অস্ত্র ন্যস্ত করে, তাহা চিকিৎসকের শল্যচিকিৎসার ছুরির ন্যায়। এই অস্ত্রের উদ্দেশ্য জীবন রক্ষা, সমাজকে সংক্রমণ হইতে বাঁচানো। কিন্তু চিকিৎসকের ছুরি যদি ডাকাতের ছুরিতে রূপান্তরিত হয়, তাহা হইলে তাহা যেমন আর চিকিৎসা থাকে না, তেমনি নির্বাচন সুষ্ঠু করিবার নামে যদি নির্বিচার গ্রেফতার চলিতে থাকে, তাহা হইলে তাহা উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনসমূহে দেখা যাইতেছে-দিনমজুর, সংবাদপত্র বিক্রেতা, কিশোর, এমনকি রাজনীতির সহিত সরাসরি সম্পৃক্ত নহে-এমন সাধারণ মানুষও 'ডেভিল' আখ্যায় গ্রেফতারের শিকার হইতেছেন। বহু ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠিয়াছে, গর্ত হইতে খুঁজিয়া, টানিয়া বাহির করিয়া গ্রেফতার করা হইতেছে-যেইখানে আইনি প্রমাণের চাইতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাই মুখ্য চালিকাশক্তি।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও অপরাধ-গবেষণা প্রতিবেদন দেখাইতেছে, যখন রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের লক্ষ্যবস্তু অপরাধী হইতে সরিয়া গিয়া সাধারণ নাগরিকের দিকে ঘুরিয়া দাঁড়ায়, তখন সমাজে নীরব ক্ষোভ সঞ্চিত হইতে থাকে। নিরপরাধ যাহাদের গ্রেফতার করা হইতেছে, তাহাদের মধ্য হইতে হয়তো ৯০ ভাগ এই অন্যায়কে ভাগ্যের লিখন বলিয়া মানিয়া লইবে। কিন্তু যদি অবশিষ্ট ১০ শতাংশও এই অপমান-অপদস্থকে ভবিষ্যতে প্রতিশোধের ভাষায় রূপান্তর করে, তাহা হইলে আমাদের সমাজে অশান্তির বাতাবরণ চলিতেই থাকিবে। কয়লার পানি দিয়া যেমন কয়লা পরিষ্কার করা যায় না, তেমনি হিংসা দিয়া হিংসা দূর করা যায় না। বরং হিংসার পর হিংসা চলিতেই থাকে-শুধু পক্ষ বদলায়, ভূমিকা বদলায়, শিকার বদলায়। এইভাবে কোনো সমাজ সুষ্ঠু, স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক হইতে পারে না।

পৃথিবীর যেই সকল দেশে এই ধরনের প্রতিহিংসামূলক রাষ্ট্রীয় চর্চা দীর্ঘদিন চলিয়াছে, সেই সকল জনপদে হিংসা শেষ পর্যন্ত স্থায়ী আসন পাতিয়াছে। লাতিন আমেরিকার একাধিক দেশে রাজনৈতিক দমননীতির নামে নির্বিচার গ্রেফতার ও 'শত্রু চিহ্নিতকরণ' পরবর্তী দশকে গ্যাং সহিংসতা ও গৃহসংঘাত বহুগুণ বৃদ্ধি করিয়াছে। পশ্চিম এশিয়ার কিছু দেশে বিরোধী মত দমনের কৌশল সাময়িক নিয়ন্ত্রণ আনিলেও, পরিসংখ্যান দেখাইতেছে-পরবর্তী প্রজন্মে উগ্রতা ও সশস্ত্র প্রতিক্রিয়া আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করিয়াছে। আফ্রিকার কয়েকটি দেশে নির্বাচনপূর্ব কঠোর অভিযানের ফল হইয়াছে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থাহীনতা-যেইখানে সহিংসতার চক্র ভাঙিবার বদলে তাহা প্রজন্মের পর প্রজন্মে সঞ্চারিত হইয়াছে।

এই জনপদের ইতিহাস আমাদের অজানা নহে। পাকিস্তান আমল হইতে গত ৭৪ বৎসর ধরিয়া আমরা দেখিয়াছি-প্রতিহিংসার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কাহারো কল্যাণ আনে নাই। আজ যদি 'ডেভিল হান্ট'-এর নামে গর্ত হইতে খুঁজিয়া কোনো প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নিরীহ কর্মীদের যথেচ্ছাচারভাবে গ্রেফতার করা হয়, তাহা হইলে উহা অপরাধ কমাইবে না-বরং ভবিষ্যৎ হিংসাকেই বাড়াইয়া দিবে। তাহাই যদি হয়, তাহা হইলে ইহার শেষ কোথায়? সাধারণ জনগণ শান্তিতে বসবাস করিতে চাহে। কিন্তু হিংসা-প্রতিহিংসার এই খেলা আর কতকাল চলিবে?