ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের আবাসিক এলাকায় প্রায় পাঁচ শতাধিক অবৈধ রাসায়নিক গুদাম গড়ে উঠেছে। এসব গুদামে সংরক্ষিত রয়েছে লাখ লাখ লিটার তরল ও পাউডার জাতীয় রাসায়নিক। প্রশাসন ও জনসাধারণের নজর এড়াতে রাতের আঁধারে গোপনে এসব গুদামের মালামাল আনা-নেওয়ার কাজ করা হয়। ভবন মালিকরা অবৈধ জেনেও মোটা অঙ্কের অর্থের লোভে আশপাশের বাসিন্দাদের জীবন চরম ঝুঁকিতে ফেলে রাসায়নিকের গুদাম ভাড়া দিচ্ছেন। এতে প্রায় সময় দুর্ঘটনায় প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটছে।
এরপরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত উপজেলায় অন্তত ৩০টির বেশি বড় আগুন ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন প্রায় ৫০ জন। এর মধ্যে ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ার হিজলতলার প্রাইম পেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ২২ জন পুড়ে মারা যান।
সরেজমিনে জানা গেছে, তেঘরিয়া ইউনিয়নের বনগ্রাম এলাকায় ৩৮টি, আব্দুল্লাহপুরের পলাশপুর এলাকায় ১৮৯টি, একই এলাকার বাগানবাড়ি বেড়িবাঁধ এলাকায় ১৯৭টি রাসায়নিকের গুদাম রয়েছে। এসব গুদামে এসিডন, টলউইন, ইথাইল এসিডেট, মিথাইলিন ক্লোরাইড, মিথানলসহ সব তরল রাসায়নিকের বিপুল মজুদ রয়েছে।
এছাড়া কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন কালিন্দী ইউনিয়নের বোরহানিবাগ, গদাবাগ, আতাশুর এলাকায় ৪৮টি রাসায়নিকের গুদাম রয়েছে। এসব গুদামেও মজুত রয়েছে ক্যালসিয়াম, সোডা, ফ্যারাসাফেটসহ পাউডার জাতীয় রাসায়নিক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকার এক রাসায়নিক ব্যবসায়ী জানান, পুরান ঢাকায় রাসায়নিক মজুতের বিষয়ে কড়াকড়ি নিয়ম থাকায় গোপনে বনগ্রাম এলাকায় একটি ফাঁকা ঘর ভাড়া নিয়ে সেখানে রাসায়নিক মজুত রাখছেন। তার মতো অনেকেই কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ঘর ভাড়া নিয়ে রাসায়নিক গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন।
রোববার দুপুর ৩টার দিকে কালিন্দী ইউনিয়নের বাঁকা চড়াইল কবরস্থান সড়ক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কবরস্থানের প্রধান ফটকের বিপরীত পাশে প্রায় আধা একর জায়গা জুড়ে হাজি আনসার হোসেন নামের আধাপাকা মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। মার্কেটে প্রবেশমুখে মুদি ও জুতার দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে। আর মার্কেটের অভ্যন্তরে কয়েকটি কক্ষে রাসায়নিকের গুদাম। ঐ কক্ষগুলোর বাইরে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বৈদ্যুতিক তার ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সেই ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের গুদামের পাশেই অর্ধশতাধিক দরিদ্র পরিবার বসবাস করছে। তারা জানেনও না তাদের ঘরের সঙ্গে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক গুদাম রয়েছে।
বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ঐ গুদাম থেকে তরল রাসায়নিক ভর্তি ড্রাম বের করছিলেন তিন জন শ্রমিক। তাদের এক জনের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। তিনি জানান, সে গুদামের মালিককে চেনেন না। শাহীন নামের এক ব্যক্তি তাদের কল করে পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক মালামাল আনা-নেওয়া করেন।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর আগে পুরান ঢাকার নজরুল অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড, রূপসা কেমিক্যাল ও এস এস কর্পোরেশনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান হাজি আনসার মার্কেটে পৃথক কক্ষ ভাড়া নিয়ে অবৈধভাবে রাসায়নিকের গুদাম গড়ে তুলেছেন। এসব গুদামে অন্তত শতাধিক ড্রাম রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে। প্রত্যেকটি ড্রামের ধারণ ক্ষমতা ১৬৫ লিটার। সেই হিসেবে ঐসব গুদামে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক তরল মজুত রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে প্রতিবেদক পরিচয় গোপন করে নিজেকে রাসায়নিক ব্যবসায়ী বলে হাজি আনসার হোসেন মার্কেটে গুদাম ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে কথা বলেন মার্কেটের এক দোকানির (৩৪) সঙ্গে। তিনি প্রতিবেদককে জানান, মার্কেটের ভেতরের সব ঘর কেমিক্যালের গুদাম হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। যদি খালি থাকে তাহলে আপনিও ভাড়া নিতে পারবেন। প্রতিবেদক ঐ দোকানিকে যখন প্রশ্ন করেন প্রশাসন ও পুলিশ কোনো ঝামেলা করে না? তিনি জানান, না, সব কিছুই ম্যানেজ আছে।
কিছুক্ষণ পর সেখানে হাজির হন এক ব্যক্তি। নিজেকে সেলিম মিয়া পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, গুদাম খালি আছে, ভাড়া দিমু। ভাড়া লাগব মাস প্রতি ২৫ হাজার, আর অ্যাডভান্স (অগ্রিম) লাগবো ৩ লাখ টাকা। পরে তার সঙ্গে হারিকেন ফ্যাক্টরির ফাঁকা জায়গা পরিদর্শন করেন এ প্রতিবেদক।
জায়গাটি পছন্দ হয়েছে বলে জানালে সেলিম মিয়া বলেন, এখানে কোন ধরনের মাল রাখবেন? উত্তরে প্রতিবেদক বলেন, এখানে থিনার, মিথানল, সলভেন জাতীয় রাসায়নিক রাখা হবে। এসব রাসায়নিকের নাম শুনে সেলিম মিয়া বলেন, এগুলাতে আগুন ধরে নাকি? প্রতিবেদকের হ্যাঁ সূচক উত্তর শুনার পর তিনি বলেন, তাইলে ভাই অগ্রিম লাগবো ৭ লাখ, আর ভাড়া দিতে অইব মাস প্রতি ৫০ হাজার। হঠাৎ ভাড়া দ্বিগুণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলা রিস্কি মাল। প্রশাসনের ঝামেলা আছে। হেগো ম্যানেজ করতে হয়। তাই ভাড়া বেশি।
কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওমর ফারুক দৈনিক ইত্তেফাককে বলেন, অনেকেই তথ্য গোপন করে কেরানীগঞ্জে রাসায়নিকের গুদাম গড়ে তুলছে। শিগগিরই ঐসব রাসায়নিকের গুদামের তালিকা তৈরি করা হবে। পরে গুদাম মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের হুঁশিয়ার করা হবে। এরপরও যদি তারা নির্দেশনা অমান্য করেন তাহলে ঐসব গুদাম উচ্ছেদ করে ভবন ও গুদাম মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, কোনো অবস্থাতেই আবাসিক এলাকায় অবৈধ রাসায়নিক গুদাম গড়ে তোলা যাবে না। এতে যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটে জনসাধারণের প্রাণহানি ঘটতে পারে। যারা এ ধরনের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে তারা যতই প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর হোক, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না।