‘ড্রাইভিং পরীক্ষায় পাসের জন্য প্রতিজনকে দিতে হয় দুই হাজার টাকা’

নওগাঁর বিআরটিএ অফিসে বেশিরভাগ কার্যক্রমে টাকা ছাড়া কাজ হয় না বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি নওগাঁর টিটিসিতে (টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার) ড্রাইভিং কোর্সের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় পাস করার নামে প্রতিজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে দুই হাজার টাকা নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

টিটিসি ড্রাইভিং বলতে সরকার পরিচালিত কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণকে বোঝানো হয়, যেখানে হালকা ও ভারী যানবাহন চালানো, ট্রাফিক নিয়মকানুন এবং গাড়ির প্রাথমিক রক্ষণাবেক্ষণ শেখানো হয়। এই প্রশিক্ষণ বিনামূল্যে ৩ থেকে ৪ মাস মেয়াদি হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ে ভর্তি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়। গত ডিসেম্বর মাসে নওগাঁর টিটিসিতে চার মাসব্যাপী ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়। 

তবে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, বিআরটিএ যেন আমাদের কেউ পরীক্ষায় ফেল না করে, সেই জন্য প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে দুই হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে।

গত ডিসেম্বর মাসের ২৮তারিখে নওগাঁ টিটিসি কেন্দ্রে শেষ হয়েছে ৪ মাস ব্যাপী ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কোর্স। সেই কোর্সের একজন শিক্ষার্থী বগুড়ার শামীম বলেন, ‘গত ২৮ডিসেম্বর ছিলো প্রশিক্ষণের শেষ দিন। এই দিনে কোর্সের স্যাররা এসে বলেন বিআরটিএ যেন কোন শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় ফেল করে না দেয় সেই জন্য প্রত্যেককে দুই হাজার করে টাকা দিতে হবে। স্যারের কথা মতো দুইজন বড় ভাই প্রথম ব্যাচের ২৫জন ও দ্বিতীয় ব্যাচের ২৪জন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দুই হাজার করে টাকা তুলে স্যারদের দিয়েছে। অথচ আমরা জানি এই কোর্স করতে কোন টাকা কোথাও দিতে হয় না। এই কোর্স সম্পন্ন বিনামূল্যের কোর্স। টাকা দিয়েই যদি পাস করতে হবে তাহলে সরকারি ভাবে করার কী দরকার। বাহিরে গিয়ে দালালদের মাধ্যমেই করা ভালো।’

নওগাঁ টিটিসির অতিথি প্রশিক্ষক (ড্রাইভিং) মো. ওয়ালীউল্লাহ সনি বলেন, ‘শুধু নওগাঁ নয় সারা দেশের এই কোর্স পরিচালনা করতে গিয়ে বিআরটিএ কে ম্যানেজ করতে হয়। যদি ম্যানেজ করা না হয় তাহলে বিভিন্ন অজুহাতে পরীক্ষায় প্রশিক্ষণার্থীদের ফেল করে দেওয়া হয়। এতে করে কোর্সের সঙ্গে জড়িতদের নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তাই এমন ঝামেলা থেকে মুক্ত হতে কোর্স শেষে প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে কিছু টাকা তোলা হয়। সেই টাকা দিয়ে কোর্স শেষে এক খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা হয়। সেই আয়োজনে অবশিষ্ট টাকা বিআরটিএ-এর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়। এই নিয়ম বহুদিন যাবত চলে আসছে। আমরা যারা এই কোর্সের সঙ্গে জড়িত তারা বিআরটিএ-এর কাছে জিম্মি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাণীনগর টিটিসির এক শিক্ষক বলেন, ‘ড্রাইভিং কোর্সের সঙ্গে আমরা যারা জড়িত তারা বিআরটিএ-এর হয়রানি থেকে বাঁচতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা তুলতে বাধ্য হই। যদি কোর্স শেষে বিআরটিএ-কে মোটা অংকের সম্মানী দেওয়া না হয় তাহলে তারা নানা বাহানায় কোর্সের যারা একটু ভালো প্রশিক্ষণার্থী তারাসহ যারা একটু দুর্বল তাদেরকেও ফেল করে দেয়া হয়। আর এই কোর্স মূলত অশিক্ষিত, কম শিক্ষিতসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শ্রমজীবীরাই বেশি করে। তাই তারা যে কোর্স শেষে পরীক্ষায় খুব ভালো করে সেটাও নয়। তাই সব মিলিয়ে এমন কাজ করতে কোর্স সংশ্লিষ্টরা বাধ্য হন।’

নওগাঁ বিআরটিএয়ের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) মো. রাশেদুজ্জামান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি নওগাঁতে নতুন। পরীক্ষায় পাস করে দেওয়ার নামে কোনো টাকা গ্রহণের সুযোগ নেই। যদি কেউ এমন অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িত থাকে, লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’

নওগাঁর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কোর্স কমিটির সভাপতি জান্নাত আরা তিথি জানান, কোর্স শেষে পরীক্ষায় পাস করে দেওয়ার নামে টাকা গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করলে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।