আল-জাজিরার বিশ্লেষণ

সৌদি থেকে সুদান: পাকিস্তান কি আরব বিশ্ব জুড়ে সামরিক উপস্থিতি সম্প্রসারণ করতে পারবে?

বিশ্বের বড় অস্ত্রচুক্তির তুলনায় অঙ্কটা খুব বড় নয়, প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের। কিন্তু পাকিস্তান থেকে সুদানের সেনাবাহিনীর কাছে যুদ্ধবিমান ও অস্ত্র বিক্রির যে চুক্তি চূড়ান্তের পথে- তা আফ্রিকার এই দেশটির প্রায় তিন বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সুদানে সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর সংঘাতে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন দশ হাজারের বেশি মানুষ, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন কোটি মানুষ। আরএসএফের বিরুদ্ধে নারী ও শিশুদের ওপর ভয়াবহ যৌন সহিংসতার অভিযোগও উঠেছে। এমন প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের এই অস্ত্র সরবরাহ যুদ্ধের ভারসাম্য সেনাবাহিনীর দিকে ঠেলে দিতে পারে।

তবে সুদান চুক্তিটি একক কোনো ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আরব বিশ্বে পাকিস্তানের সামরিক সরঞ্জাম ও কৌশলগত প্রভাব দ্রুত বাড়ছে- যা দেশটির ঐতিহ্যগত ‘প্রশিক্ষক ভূমিকাকে’ ছাড়িয়ে সরাসরি নিরাপত্তা সরবরাহকারীতে পরিণত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি, নতুন মোড়
আরব বিশ্বে পাকিস্তানের এই পরিবর্তিত ভূমিকায় বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে সৌদি আরব। গত বছরের সেপ্টেম্বরে দুই দেশ ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ (এসএমডিএ) স্বাক্ষর করে। মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার প্রেক্ষাপটেই এই চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব পাকিস্তানের তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানে আগ্রহ দেখিয়েছে। যদিও সৌদি বিমানবাহিনীর বহরে রয়েছে অত্যাধুনিক মার্কিন ও ইউরোপীয় যুদ্ধবিমান এবং তারা এফ-৩৫ সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় আছে, তবু ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজছে রিয়াদ।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সৌদি আরবকে কৌশলগত বৈচিত্র্য এনে দিচ্ছে, একই সঙ্গে ইসলামাবাদের আঞ্চলিক গুরুত্ব বাড়াচ্ছে।

জেএফ-১৭: কম দামে ‘যুদ্ধ পরীক্ষিত’
পাকিস্তান ও চীনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান এখন পাকিস্তানের সামরিক রপ্তানির প্রধান হাতিয়ার। তুলনামূলক কম দামে (প্রতি বিমানের মূল্য আনুমানিক ২ কোটি ৫০ থেকে ৩ কোটি ডলার), আধুনিক রাডার, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতা এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা এই বিমানকে অনেক দেশের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

বিশেষ করে গত বছর ভারতের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতে পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর সক্রিয় ব্যবহারের পর জেএফ-১৭-এর প্রতি আগ্রহ বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এরই মধ্যে আজারবাইজান, নাইজেরিয়া ও মিয়ানমার এই বিমান ব্যবহার করছে। আরব বিশ্বে সৌদি আরব ছাড়াও ইরাক, লিবিয়া ও সুদান সম্ভাব্য ক্রেতা হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।

কূটনৈতিক ভারসাম্যের কঠিন চ্যালেঞ্জ
অস্ত্র রপ্তানির এই বিস্তার পাকিস্তানের জন্য কূটনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করছে। সুদানে যে সেনাবাহিনীকে পাকিস্তান অস্ত্র দিচ্ছে, তাদের প্রতিপক্ষ আরএসএফকে সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থন দিচ্ছে- এমন অভিযোগ রয়েছে। আবার লিবিয়ায় যে পক্ষের সঙ্গে পাকিস্তান চুক্তি করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও সুদানের সেনাবাহিনীর অভিযোগ আছে।

ফলে একই অঞ্চলে পরস্পরবিরোধী শক্তির কাছে অস্ত্র সরবরাহ করতে গিয়ে ইসলামাবাদকে সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে, না হলে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অর্থনৈতিক চাপে অস্ত্র রপ্তানির কৌশল
অস্ত্র রপ্তানির এই জোরালো উদ্যোগ পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত। আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির আওতায় থাকা দেশটি বৈদেশিক মুদ্রার উৎস বাড়াতে চায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এক অর্থবছরে পাকিস্তানের অস্ত্র রপ্তানি ১৩ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে।

সরকারি মহলের দাবি, বড় বড় যুদ্ধবিমান চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। যদিও কেউ কেউ মনে করছেন, এসব আলোচনা বাস্তব চুক্তিতে রূপ নেবে কি না- তা এখনো অনিশ্চিত।

বহুমুখী অস্ত্রবাজারে পাকিস্তান
বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতামূলক অস্ত্রবাজারে পাকিস্তান নিজেকে একটি ‘মধ্যম শক্তির সরবরাহকারী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়; বরং বহুমুখী প্রতিরক্ষা বাজারে বাস্তববাদী অভিযোজন।

সব মিলিয়ে, সুদানের সঙ্গে অস্ত্র চুক্তি শুধু একটি বাণিজ্যিক লেনদেন নয়- এটি আরব ও আফ্রিকান ভূরাজনীতিতে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও কৌশলগত উপস্থিতির স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।