অর্থনৈতিক উন্নয়নে আত্মকর্মসংস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ

আত্মকর্মসংস্থান একটি স্বাধীন পেশা। আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত থাকলে তরুণ সমাজ নানা সমাজবিরোধী কাজে লিপ্ত না থেকে সমাজ ও দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় এখানে মজুরি অনেক কম। আবার আমাদের দেশে মৌসুমি বেকারত্বের সমস্যাও প্রকট। এসব সমস্যার সমাধানে আত্মকর্মসংস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে শহরমুখী জনস্রোত নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রামীণ সমাজ ও অর্থনীতির উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়। আত্মকর্মসংস্থানের মানসিকতা যুবসমাজকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে এবং স্বেচ্ছামূলক কাজে উত্সাহিত করে। আত্মকর্মসংস্থানের বয়স কোনো সমস্যা নয়। এর মাধ্যমে যে-কোনো বয়সের মানুষ তার দক্ষতা অনুযায়ী অর্থ উপার্জন করতে পারে। ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১০’ অনুযায়ী আমদের মোট জাতীয় উত্পাদনের প্রায় ৫০ ভাগ আসে সেবা খাত থেকে, প্রায় ২০ ভাগ আসে শিল্প খাত থেকে। 

দিন বদলের অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে কুটিরশিল্প অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখা এবং সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস (এসডিজি) অর্জনে এসএমই খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিকল্প নেই। তারুণ্যের শক্তি বাংলাদেশের সমৃদ্ধি—এই স্লোগান সামনে রেখে দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ যুবসমাজকে সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খল ও উত্পাদনমুখী শক্তিতে রূপান্তরের জন্য সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে অর্থনীতির মূলধারায় নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। আমাদের নারী সমাজের নিষ্ঠা, উদ্ভাবনী শক্তি ও শ্রম নিপুণতার কল্যাণে অর্থনীতির মূল স্রোতে তাদের অংশগ্রহণ ক্রমশই বাড়ছে। নারী সমাজের মধ্যে রয়েছে অফুরান সম্ভাবনা ও বিস্ময়কর সৃজনশীলতা। একটু সহযোগিতা পেলে তারাও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। সৃষ্টি করতে পারে আত্মকর্মসংস্থান। যে সমাজ ও দেশে উদ্যোক্তার সংখ্যা যত বেশি, সেই সমাজ বা দেশ অর্থনৈতিকভাবে তত উন্নত।

আত্মকর্মসংস্থানের সহায়ক প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন—বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট, মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, গ্রামীণ মহিলাদের কর্মসংস্থান প্রকল্প, যুব প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং নট্রামস (শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত) ইত্যাদি। এদের মাধ্যমে অবহেলিত-বঞ্চিত জনগোষ্ঠী, যুবসমাজ বিশেষত নারীদের আর্থিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাত্রা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আত্মকর্মসংস্থান তথা ব্যবসায়ের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে সঠিক প্রকল্প নির্বাচনের ওপর । প্রকল্প হচ্ছে কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে, নির্দিষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রণীত পরিকল্পিত ও সুচিন্তিত কর্ম পদ্ধতি। ব্যবসায় প্রকল্প প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ হলো ধারণা চিহ্নিতকরণ এবং ধারণাগুলো মূল্যায়ন করে একটিকে নির্বাচন করা। প্রকল্প ধারণা চিহ্নিত করার সময় উদ্যোক্তার নিজের শখ বা আগ্রহ আছে এমন পণ্য, প্রকৃত চাহিদা আছে এমন পণ্য,  বিদ্যমান পণ্যের অসুবিধা, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ ইত্যাদির দিকে দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। সাধারণত দুটি পদ্ধতির মাধ্যমে চিহ্নিত ধারণাগুলো মূল্যায়ন করে প্রকল্প নির্বাচন করা যায়। একটি ম্যাক্রোস্কিনিং যেমন—জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক পরিবেশ, প্রাকৃতিক পরিবেশ, রাজনৈতিক পরিবেশ, সাংস্কৃতিক পরিবেশ, আইনগত পরিবেশ এবং অপরটি মাইক্রোস্কিনিং যথা—বাজার চাহিদা, কারিগরি দিক, বাণিজ্যিক দিক, আর্থিক দিক, জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান ইত্যাদি।

ব্যবসা করতে গেলে একজন উদ্যোক্তার যেসব গুণাবলি থাকা আবশ্যক তা হলো আত্মবিশ্বাস, স্বাধীনচেতা মনোভাব, উদ্যম, সাংগঠনিক ক্ষমতা, সাহস, অধ্যবসায়, সংবেদনশীলতা, একাগ্রতা, নমনীয়তা, শৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী শক্তি, কঠোর পরিশ্রম করার ক্ষমতা, ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতা, নেতৃত্বদানের যোগ্যতা, পুঁজি সংগ্রহের ক্ষমতা, কৃতিত্ব অর্জনের আকাঙ্ক্ষা, চ্যালেজ গ্রহণ করার মানসিকতা, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা গ্রহণের মানসিকতা ইত্যাদি।

সবশেষে বলতে চাই, প্রতিটি সাফল্যের পেছনে থাকে দৃঢ় অঙ্গীকার, অপরিসীম ধৈর্য ও মনোবল। অঙ্গীকার, মনোবল আর সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করা সম্ভব।

n লেখক : ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার,

সোনালী ব্যাংক লিমিটেড