ভাবনার বেড়াজাল

আজ আমরা কাদের কাছে জিম্মি? বিবেক, গুজব না বিচারের কাছে। তুবা হারিয়েছে তার মাকে, সন্তানের জন্য সেই মা গিয়েছিলেন স্কুলে, একদল অমানুষ গুজবের বাহানায় নিরপরাধ মাকে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দিল। প্রতিবন্ধী বাবা সন্তানের ভালোবাসার টানে স্ত্রীর বর্তমান স্বামীর বাড়িতে গিয়ে সন্তানকে লুকিয়ে দেখতে যান। কিন্তু গুজবের কারণে লাশ হয়ে ফিরতে হলো তাকে। আমাদের সমাজে এরকম আরো অনেক ঘটনা ঘটেছে এবং ঘটছে।

কিন্তু এসব কিসের জন্য? জীবিকার তাগিদে ও সন্তানদের পড়াশোনা করিয়ে মানুষ করে গড়ে তুলতে কত না কষ্ট করে চলেছে। তবে একের পর এক নানা তাণ্ডব তাদের স্বপ্ন ও আশাকে ধুলিস্যাত্ করে দিচ্ছে। এসব কার্যক্রমের মধ্যে সম্প্রতি সময়ে সবচেয়ে বহুল আলোচিত হচ্ছে ‘গুজব বাহানা’!

কিছু কিছু মানুষ ব্যক্তিগত হিংসাকে গুজবে পরিণত করছে। সমাজে আমরা কেন এমন হচ্ছি? বিবেকবোধ, নৈতিকতা হারিয়ে কেনই বা অমানবিক কাজে লিপ্ত হচ্ছি? সত্যকে মিথ্যার জোরে মাটি চাপা দিতে দিতে আমরা যে কখন নিজের মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলছি, তা বেমালুম ভুলে গেছি। বর্তমান সমাজ আমার সাধারণ মৃত্যুর গ্যারান্টিও দিতে পারছে না। 

দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার দায়দায়িত্বটা স্বভাবতই রাষ্ট্রের। তবে আমরা কেন দোষ দিচ্ছি না প্রচলিত সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রকে? কেন দোষ দিচ্ছি না আমাদের নিজেদেরকে?  নিজেদের কেন অপরাধী ভাবছি না? কারণ আমরা চাইলে রিফাতকে বাঁচাতে পারতাম, তুবার মাকে বাঁচাতে পারতাম। কিন্তু আমরা যাইনি, দূর থেকে শুধু তাকিয়েই দেখেছি সিনেমার অ্যাকশন শুটিংয়ের মতো। 

আমাদের মন-মানসিকতা তো এরকম হওয়ার কথা ছিল না। ১৯৫২ সালে মায়ের ভাষাকে বাঁচাতে পাকিস্তানিতের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন বাংলার দামাল সন্তানেরা। ১৯৭১ সালে এই দেশমাতাকে বাঁচাতে সবাই একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, প্রাণ দিতেও দ্বিধাবোধ করেননি মুক্তিসেনারা। তবে এখন কেন আমাদের দ্বিধা? কেন আমরা বিপথগামী হচ্ছি? দায় কি আমার, না সমাজের? না রাষ্ট্রের? কোন স্বার্থ আমাদের এ পথে ধাবিত করছে? দেশে বাড়ছে শিক্ষার হার। প্রধান্য পাচ্ছে শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম। অশিক্ষা ও কুসংস্কারের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসছি। বাহান্নো, একাত্তর পেরিয়ে দীর্ঘ পথ পরিক্রমার পরও আজ কেন আমাদের এমন করুণ দশা! এর থেকে আমাদের পরিত্রাণের উপায় কী?

মৌলভীবাজার