বিশ্বের ইতিহাসে কিছু উচ্চারণ আছে, যাহা সময়ের দলিল হইয়া থাকে। তাহা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার সীমা অতিক্রম করিয়া এই উচ্চারণগুলি ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সাম্প্রতিক মন্তব্য- 'বৈশ্বিক সহযোগিতা এখন মৃত্যুশয্যায়'-তেমনই এক উচ্চারণ। ইহা কোনো নাটকীয় বাক্য নহে, কোনো কূটনৈতিক অতিশয়োক্তিও নহে। বরং বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার এক নির্ভুল, কঠোর ও অস্বস্তিকর প্রতিফলন।
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে লন্ডনের মেথডিস্ট সেন্ট্রাল হলে প্রদত্ত এই ভাষণের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কারণ, ঠিক এই স্থানেই আট দশক পূর্বে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হইয়াছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর মানবজাতি যেই প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে সহযোগিতা, শান্তি ও সম্মিলিত নিরাপত্তার শপথ গ্রহণ করিয়াছিল, সেই আদর্শই আজ প্রশ্নবিদ্ধ। গুতেরেস যথার্থই বলিয়াছেন-বর্তমান বিশ্ব বাস্তবিক অর্থেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সংকটে নিপতিত। এই সংকট আকস্মিক নহে। ইহা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্বার্থপরতা, নেতৃত্বের দূরদর্শিতার অভাব এবং নৈতিক অবক্ষয়ের সমষ্টিগত ফল। রাষ্ট্রসমূহ ক্রমশ বহু পাক্ষিকতার পথ পরিত্যাগ করিয়া একতরফা সিদ্ধান্ত ও শক্তির রাজনীতিতে ঝুঁকিতেছে। ফলস্বরূপ, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলি দুর্বল হইতেছে এবং বৈশ্বিক ঐক্য ভাঙিতেছে।
বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয়ের পরিসংখ্যান এই বাস্তবতার নির্মম প্রমাণ। গত বছর বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি পাইয়া দাঁড়াইয়াছে ২.৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এই বিপুল ব্যয় মানবজাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতেছে-এমন দাবি ক্রমশ ফাঁপা হইয়া পড়িতেছে। একদিকে দারিদ্র্য-ক্ষুধা-স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি ও শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, অন্যদিকে অস্ত্রের পাহাড়। এই বৈপরীত্য সভ্যতার অগ্রগতির নহে, বরং দিগ্ভ্রান্তির ইঙ্গিতই বহন করে। জলবায়ুসংকট এই দিগ্ভ্রান্তির আরেকটি স্পষ্ট উদাহরণ। পৃথিবী যখন একের পর এক তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙিতেছে, যখন বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়ে মানুষের জীবন বিপন্ন, তখন জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলির মুনাফা বাড়িতেছে। অর্থাৎ, ভবিষ্যৎকে বন্ধক রাখিয়া বর্তমানের স্বার্থ রক্ষা করা হইতেছে। জলবায়ু পরিবর্তন কোনো একক রাষ্ট্রের সমস্যা নহে, ইহা সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বসংকট। তবু সহযোগিতার পরিবর্তে দায় এড়াইবার প্রবণতাই প্রবল। গুতেরেস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল অ্যালগরিদমের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছেন। প্রযুক্তি মানবকল্যাণের সহায়ক হইতে পারিত; কিন্তু নীতিগত নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক সমন্বয় ছাড়া ইহা আজ মিথ্যা তথ্য, ঘৃণা ও বিভাজন ছড়াইবার অস্ত্র হইয়া উঠিতেছে। এই ডিজিটাল বিশৃঙ্খলা কর্তৃত্ববাদী শাসকদের হাতে নতুন ক্ষমতার চাবিকাঠি তুলিয়া দিতেছে।
এই সমস্ত সংকটের মূল কেন্দ্রে রহিয়াছে গুতেরেসের ভাষায় 'দায়মুক্তির সংস্কৃতি' এবং 'শূন্য-সমষ্টির মানসিকতা'। শক্তিশালী রাষ্ট্র ও নেতারা মনে করিতেছেন- একজনের লাভ মানেই অন্যের ক্ষতি। এই দৃষ্টিভঙ্গি বৈশ্বিক সহযোগিতার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। কারণ মানবসভ্যতার ইতিহাস আমাদের শিখাইয়াছে-টিকসই অগ্রগতি কেবল সহযোগিতার মধ্য দিয়াই সম্ভব। একতরফা নীতি, শক্তির প্রদর্শন ও আন্তর্জাতিক আইন অবজ্ঞা করিয়া কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপদ থাকিতে পারে না। জাতিসংঘ নিজেও এই সংকটের বাইরে নহে। বহু ক্ষেত্রে ইহার সীমাবদ্ধতা, অকার্যকারিতা ও ক্ষমতাহীনতা প্রশ্নের সম্মুখীন; কিন্তু এই প্রতিষ্ঠান দুর্বল বলিয়াই কি আমরা বহু পাক্ষিকতাকে পরিত্যাগ করিব? বরং প্রয়োজন জাতিসংঘকে সংস্কার, শক্তিশালী ও প্রাসঙ্গিক করিবার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও সম্মিলিত দায়িত্ববোধের বিকল্প আজও মানবসভ্যতার কাছে নাই।
অতএব, 'মৃত্যুশয্যা' কথাটি যদি নিছক রূপক হইয়া থাকিতে হয়, তাহা হইলে বিশ্বনেতৃত্বকে এখনই সিদ্ধান্ত লইতে হইবে। শক্তির রাজনীতি পরিত্যাগ করিয়া সহযোগিতার পথে ফিরিতে না পারিলে, এই রূপক ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতায় রূপ লইবে। তখন এই প্রশ্নও থাকিবে না-বৈশ্বিক সহযোগিতা মরিয়াছে কি না। বরং প্রশ্ন উঠিবে, মানবসভ্যতাই কি তাহার সহিত শেষ হইবে?