উত্তপ্ত পরিস্থিতি কি আমাদের পিছু ছাড়িবে না?

এই শতাব্দীর সূচনালগ্নে জলবায়ু পরিবর্তনকে আমরা বহু সময়েই ভবিষ্যতের অশনিসংকেত হিসাবে চিহ্নিত করিয়াছি; কিন্তু কালের নিষ্ঠুর পরিহাস এই যে, সেই ভবিষ্যৎ আর অপেক্ষা করে নাই। উহা ইতিমধ্যেই আমাদের দুয়ারে করাঘাত করিতেছে। সাম্প্রতিক গবেষণা বলিতেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের যে ছয়টি দেশ প্রবল তাপমাত্রার অভিঘাতে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হইবে, তাহার অন্যতম বাংলাদেশ। এই তথ্য কেবল আরেকটি আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান নহে-ইহা আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক বাস্তবতার প্রতি এক নির্মম সতর্কসংকেত।

এতদিন জলবায়ুঝুঁকি বলিতে আমরা বুঝিয়াছি উপকূল ডুবিয়া যাওয়া, ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব কিংবা নদীভাঙনের হাহাকার; কিন্তু নেচার সাসটেইনেবিলিটিতে প্রকাশিত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বাধীন এই গবেষণা স্মরণ করাইয়া দিতেছে-একটি নীরব, অথচ সমান প্রাণঘাতী বিপদ আমাদের চারিদিকে ঘিরিয়া ধরিতেছে। তাহার নাম প্রবল তাপপ্রবাহ। গবেষণার তথ্যানুসারে, বৈশ্বিক উষ্ণতা যদি শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, তাহা হইলে চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি বিশ্বের প্রায় ৪১ শতাংশ মানুষ চরম তাপের মধ্যে বসবাস করিবে। ২০১০ সালে এই হার ছিল মাত্র ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র চার দশকের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ মানুষ তাপের অবিরাম চাপে বন্দি হইয়া পড়িবে।

বাংলাদেশে এই ঝুঁকি আরও সূক্ষ্ম, আরও গভীর। কারণ জাতীয় গড় তাপমাত্রা দেশের প্রকৃত পরিস্থিতিকে আড়াল করিয়া রাখে। বাস্তবে দেশের অধিকাংশ মানুষ এমন অঞ্চলে বসবাস করে, যেইখানে বৎসরে ৩ হাজারেরও অধিক 'কুলিং ডিগ্রি ডেইজ' প্রয়োজন-যাহা দীর্ঘস্থায়ী ও বিপজ্জনক তাপের ইঙ্গিত বহন করে। তাপপ্রবাহের অভিঘাত কেবল আবহাওয়ার বিষয় নহে-ইহা মানবস্বাস্থ্যের এক বিস্তৃত সংকট। গবেষণা স্পষ্ট বলিতেছে-বয়স্ক মানুষ, শিশু ও স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীই সর্বাগ্রে বিপন্ন। যাহাদের শীতলীকরণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সীমিত, যাহারা শহরের ঘিঞ্জি বস্তিতে বা গ্রামাঞ্চলের অনুন্নত ঘরে বসবাস করে-তাহাদের জন্য তাপপ্রবাহ যেন এক জ্বলন্ত উনুন হইয়া উঠিবে।

এখানেই নিহিত আছে আরেকটি গভীর বৈপরীত্য। উষ্ণ ও উপউষ্ণ অঞ্চলের দরিদ্র ও মধ্যম আয়ের দেশগুসমূহে শীতলীকরণের চাহিদা দ্রুত বাড়িবে, অথচ বৈশ্বিক উত্তরের ধনী দেশসমূহে শীত নরম হওয়ায় গরমের চাহিদা কমিয়া যাইবে। অর্থাৎ যাহারা ইতিহাসে সর্বাধিক কার্বন নিঃসারণ করিয়াছে, তাহাদের বোঝা লঘু হইবে, আর যাহারা নিঃসারণে নগণ্য ভূমিকা রাখিয়াছে, তাহারাই বহন করিবে চরম তাপের দহন। এই প্রেক্ষাপটে গবেষকরা যে 'কুলিং ট্র্যাপ'-এর সতর্কতা উচ্চারণ করিয়াছেন, তাহা বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। তাপ বাড়িলে এয়ার কন্ডিশনের চাহিদা বাড়িবে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহৃত হইলে কার্বন নিঃসারণ আরও বাড়িবে, উষ্ণতা আরও তীব্র হইবে। এই দুষ্ট চক্র ভাঙিতে না পারিলে তাপপ্রবাহ নিজেই নিজের জ্বালানি জোগাইবে। বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে ভবিষ্যতে প্রায় সারা বৎসর প্রচণ্ড গরম থাকিবার সম্ভাবনা, বর্ষার পূর্বের সময়টিতে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, এমনকি বর্ষা মৌসুমেও গরমের দাপট-এই সকলই আমাদের অপেক্ষা করিতেছে। রাজধানী ঢাকায় বৎসরে অন্তত দুইটি প্রবল তাপপ্রবাহ নগরজীবনকে কার্যত অচল করিয়া দিতে পারে। ভবিষ্যতে পরিবেশ প্রকৃতি উত্তপ্ত হইবে, আর এখন রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত। উত্তপ্ত পরিস্থিতি কি আমাদের পিছু ছাড়িবে না কখনো?

তবে এই অন্ধকার চিত্রের মধ্যেও একটি শর্তসাপেক্ষ আশার কথা গবেষণা বলিতেছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা যদি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি সীমাবদ্ধ রাখা যায়, তাহা হইলে প্রাণঘাতী তাপে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব; কিন্তু এই 'যদি'-এর ভিতরেই লুকাইয়া রহিয়াছে আমাদের দায়বদ্ধতা। তাপ-সহনশীল নগর ও আবাসন নকশা-এই সকল আর বিলাসী পরিকল্পনা নহে-ইহা টিকিয়া থাকিবার ন্যূনতম শর্ত।

প্রবল তাপ আমাদের সামনে এক নীরব অগ্নিপরীক্ষা রাখিতেছে। এই আগুনে ঘর পুড়িবে না; কিন্তু সমাজ পুড়িবে। দেওয়াল ভাঙিবে না; কিন্তু সহনশীলতা ভাঙিবে। প্রশ্ন একটিই-আমরা কি এই নীরব বিপদের ভাষা বুঝিবার পূর্বেই সিদ্ধান্ত লইব, নাকি দগ্ধ হইবার জন্য অপেক্ষা করিব?