চরিত্র হননের খেলা আর কতদিন?

সভ্য সমাজে ‘চরিত্র' শব্দটি কেবল ব্যক্তিগত গুণাবলির সমষ্টি নহে—ইহা এক প্রকার সামাজিক পুঁজি। দীর্ঘকাল ধরিয়া সততা, কর্মনিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে যাহা গঠিত হয়, তাহাই চরিত্র। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে আধুনিক রাষ্ট্র ও রাজনীতির ময়দানে এই চরিত্রই হইয়া উঠিয়াছে সবচাইতে সহজ আঘাতের লক্ষ্যবস্তু। চরিত্র হনন এখন আর ব্যতিক্রমী কোনো কৌশল নহে— বরং বহু দেশে ইহা ক্ষমতার লড়াইয়ের এক নিয়মিত অস্ত্র। প্রশ্ন উঠিতেই পারে—চরিত্র হনন কেন করা হয়? উত্তরটি জটিল নহে। সমাজে যাহারা প্রতিষ্ঠিত, যাহারা কাজ করিয়াছেন, যাহাদের উপস্থিতি জনমনে প্রভাব বিস্তার করে—তাহাদের খাটো করিবার জন্যই চরিত্র হননের আশ্রয় লওয়া হয়। ইতিহাস বলিতেছে, রোমান প্রজাতন্ত্র হইতে শুরু করিয়া আধুনিক গণতন্ত্র—সর্বত্রই এই প্রবণতা বিদ্যমান। মজার ব্যাপার হইল, যাহাদের চরিত্র হনন করা হয়, সময়ের চক্রে অনেক ক্ষেত্রেই তাহারাই পুনরায় জনগণের প্রতিনিধিত্ব করিতে আসেন। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে ‘দোষী’ হঠাৎ করিয়া ‘নির্দোষ' হইয়া যান, আর পুরাতন অভিযোগগুলি ইতিহাসের অন্ধকার গলিতে হারাইয়া যায়। তখন আবার নূতন করিয়া শুরু হয় প্রতিপক্ষের চরিত্র হননের পালা। ইহা যেন এক অন্তহীন প্রতিশোধের বৃত্ত—যেইখানে নীতি নহে, ক্ষমতাই শেষ সত্য।

বিশ্বের দিকে তাকাইলেই দেখা যাইবে, চরিত্রহননের প্রবণতা কোনো একক দেশ বা মতাদর্শে সীমাবদ্ধ নহে। যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনি রাজনীতিতে ‘character assassination' একটি সুপরিচিত শব্দ। ইউরোপে রাজনৈতিক স্ক্যান্ডাল অনেক সময় প্রকৃত অপরাধের চাইতে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবেই ব্যবহৃত হয়। আবার অনেক উন্নয়নশীল দেশে দুর্নীতির অভিযোগ কখনো ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যে নহে, বরং প্রতিপক্ষকে নিষ্ক্রিয় করিবার কৌশল হিসাবে প্রয়োগ হয়। কথায় আছে— ভুল তাহাদেরই হয়, যাহারা কাজ করে। সুতরাং, দুর্নীতি কোথায় নাই? কাজ করিলে তাহার বাই প্রোডাক্ট হিসাবে তিলমাত্র পরিমাণে হইলেও দুর্নীতি তৈরি হইবে। প্রশাসন, রাষ্ট্র বা সমাজ পরিচালনায় শতভাগ বিশুদ্ধতা একটি আদর্শিক কথা—বাস্তবে ইহা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করিয়া যদি আমরা প্রতিটি ত্রুটিকে চরিত্রগত অপরাধে রূপান্তর করি— তাহা হইলে তাহা এক অর্থে সত্য ও বাস্তবতাকেই অস্বীকার করা। কেহ কেহ চরিত্র হননের এই কৌশলকে বামপন্থা মতাদর্শের কৌশল বলিয়া মনে করেন। পুঁজিবাদকে হেয় করিবার জন্যই বুর্জোয়াদের শোষক ও চোর হিসাবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা এই যে—দুর্নীতি কোনো একক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একচেটিয়া বাইপ্রোডাক্ট নহে। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও দুর্নীতি রহিয়াছে।

এই বাস্তবতা সর্বাধিক বিপজ্জনক হইয়া উঠে যখন আমরা তরুণ প্রজন্মের দিকে দৃষ্টি দিই। এককালে শিশুকালেই আমরা নীতিগল্পে শিখিতাম—সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন হইতে শুরু করিয়া বায়েজিদ বোস্তামীর সত্যবাদিতার গল্প আমাদের ভিন্নতর মানসজগৎ তৈরি করিয়া দেয়। বায়েজিদ বোস্তামীকে তাহার মাতা সর্বদা সত্য কথা বলিতে শিক্ষা দিয়াছিলেন। একবার পথিমধ্যে ডাকাতেরা তাহাকে আটকাইয়া জিজ্ঞাসা করে—তাহার নিকট কোনো সম্পদ আছে কি না। মায়ের শিক্ষায় অবিচল বায়েজিদ বোস্তামী নির্দ্বিধায় বলিয়া দেন—তাহার জামার গোপন স্থানে কিছু স্বর্ণমুদ্রা লুকানো রহিয়াছে। বায়েজিদের এই অকপট সত্যবাদিতায় ডাকাত সর্দার বিস্মিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাহাকে ক্ষতি না করিয়া ছাড়িয়া দেয়। এই সকল কাহিনি শৈশবে আমাদের মনে একটি আদর্শিক নৈতিক কাঠামো নির্মাণ করিয়া দেয়।

সুতরাং বর্তমানে চরিত্র হননের এই সকল ঘটনা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া তৈরি করিবে? তাহারা ইহাকে কীভাবে দেখিবে? আধুনিক সমাজ তরুণদের সামনে যাহা মেলিয়া ধরিতেছে—তাহা কি বিভ্রান্তিকর নহে? এই খানে দেখা যায়—যাহারা কাজ করে, যাহারা সিদ্ধান্ত লয়—ক্ষমতার বাহিরে চলিয়া গেলেই তাহাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় গড়িয়া তোলা হয়। কাজের ফলাফল, উন্নয়ন, প্রশাসনিক সক্ষমতা—এই সকল কিছু আড়াল হইয়া যায় অভিযোগের শব্দবাক্যের পাহাড়ে।

কিন্তু আমরা কি ভাবিয়া দেখিয়াছি, চরিত্র হননের এই অবিরাম খেলা এইভাবে চলিতে থাকিলে একদিন আমরা এমন এক সমাজে উপনীত হইব, যেইখানে চরিত্র বলিয়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকিবে না—হননের জন্যও নহে। তাহা কি ঠিক হইবে?