মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত কি আঞ্চলিক দাবানলে পরিণত হইবে?

বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে মধ্যপ্রাচ্য বরাবরই এক অস্থির ভূখণ্ড। বর্তমানে একটি সংঘাতের আশঙ্কা পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড় করাইয়া দিয়াছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা যেইভাবে বাড়িতেছে, তাহা উদ্বেগজনক। কূটনৈতিক আলোচনা চলমান থাকিলেও সামরিক প্রস্তুতি, হুমকি ও পালটা সতর্কবার্তা ইঙ্গিত দিতেছে-যে কোনো ভুল হিসাব গোটা অঞ্চলকে অগ্নিগর্ভ করিয়া তুলিতে পারে।

বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রহিয়াছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। দীর্ঘদিন ধরিয়া তেহরান দাবি করিয়া আসিতেছে যে, তাহাদের পারমাণবিক উদ্যোগ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সন্দেহ করিতেছে-ইহা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসই কূটনৈতিক সংলাপকে বারংবার ভঙ্গুর করিয়া তুলিয়াছে। সম্প্রতি ওমানের মাস্কটে দুই দেশের পরোক্ষ আলোচনা শুরু হইলেও উভয় পক্ষের এজেন্ডা ভিন্নমুখী-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক প্রশ্নের পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রক্সি রাজনীতি আলোচনায় আনিতে চাহে, ইরান ইহাকে সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ বলিয়া প্রত্যাখ্যান করিতেছে।

ইতিহাস বলিতেছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত কখনোই দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ইরান একটি রাষ্ট্রমাত্র নহে-ইহা একটি আঞ্চলিক শক্তি-যাহার প্রভাব বিস্তৃত লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন প্রভৃতি ভূরাজনৈতিক অক্ষ বরাবর। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ মানে সম্ভাব্যভাবে একাধিক ফ্রন্টে সংঘাতের বিস্তার। তেহরান ইতিমধ্যে সতর্ক করিয়াছে-তাহাদের উপর হামলা হইলে গোটা অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়াইয়া পড়িবে। এই বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক অলংকার নহে, ইহা মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তব কৌশলগত সমীকরণের প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং বিমানবাহী রণতরিসহ নৌবহর মোতায়েন উত্তেজনাকে নূতন মাত্রা প্রদান করিয়াছে। অপরদিকে ইরানের সামরিক নেতৃত্ব প্রকাশ্যে বলিতেছে, তাহাদের বাহিনী 'ট্রিগারে আঙুল' রাখিয়া প্রস্তুত। সামরিক ভাষায় ইহা একটি বিপজ্জনক সংকেত-যেইখানে প্রতিরোধমূলক প্রস্তুতি এবং আক্রমণাত্মক মানসিকতার সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হইয়া যায়।

এই সংকটের আরেকটি জটিল মাত্রা হইল ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও অর্থনৈতিক চাপ শাসকগোষ্ঠীকে দুর্বল করিয়াছে বলিয়া বিশ্লেষকরা মনে করেন। ইতিহাসে বহুবার দেখা গিয়াছে-অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত রাষ্ট্র বাহ্যিক সংঘাতকে জাতীয় ঐক্যের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করে। যদিও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, ইরান সেই পথে চলিবে, তথাপি এই সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ইহা কেবল একটি নিরাপত্তা প্রশ্ন নহে, ইহা বিশ্বশক্তি হিসেবে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখিবার একটি ভূরাজনৈতিক পরীক্ষা। ইসরাইলের নিরাপত্তা, উপসাগরীয় মিত্রদের আশঙ্কা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ-সকল মিলিয়া ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকিবে না বলিয়া মনে করা হইতেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহের উদ্বেগও লক্ষণীয়। তাহারা আশঙ্কা করিতেছে-একটি সরাসরি হামলা অঞ্চলকে দীর্ঘমেয়াদি বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলিয়া দিবে, যেইখানে সামরিক বিজয় নিশ্চিত হইলেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অনিশ্চিত থাকিবে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আফগানিস্তান হইতে ইরাক পর্যন্ত সামরিক অভিযানের পরিণতি প্রায়শই প্রত্যাশিত ফল প্রদান করে নাই। ফলে আঞ্চলিক শক্তিগণ কূটনৈতিক সমাধানকেই অধিকতর কার্যকর পথ বলিয়া বিবেচনা করিতেছে। এইখানে প্রশ্ন উঠিতে পারে-সংঘাতের ঝুঁকি এত বেশি হইলে কেন উত্তেজনা অব্যাহত? উত্তর নিহিত আছে ক্ষমতার ভারসাম্যের রাজনীতিতে। যুক্তরাষ্ট্র চাহে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে আনিতে। ইরান চাহে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি। এই দুই লক্ষ্য আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী, কিন্তু বাস্তবে ইহাই আলোচনার চালিকাশক্তি। বস্তুত, পারস্য উপসাগরের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে একটি সীমিত সংঘর্ষও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তাকে বিপর্যস্ত করিতে সক্ষম।

শেষ পর্যন্ত এই সংকট আমাদের একটি চিরন্তন সত্যের দিকে ফিরাইয়া লয়-যুদ্ধ কখনোই একক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না-ইহা প্রতিক্রিয়ার চেইন সৃষ্টি করে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতায় সেই চেইন যদি সক্রিয় হয়, তাহা হইলে ইরান সংঘাত একটি আঞ্চলিক দাবানলে পরিণত হইতে পারে।