হাজারো প্রত্যাশা আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে গতকাল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান । তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরাও গতকাল শপথ গ্রহণ করেছেন। এভাবে একটি যুগসন্ধিক্ষণে নতুন সরকারের পথচলা শুরু হলো। এটি শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
বাংলাদেশ আজ এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, যেখানে অর্থনৈতিক চাপ, আইনশৃঙ্খলার উদ্বেগ এবং প্রশাসনের প্রতি আস্থাহীনতা একই সঙ্গে দৃশ্যমান । এই পরিস্থিতি ভয়াবহ মনে হলেও ইতিহাস বলে–সংকটই বড় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করে। নতুন সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি আঘাত করছে। মধ্যবিত্ত পরিবার এখন মাসের শেষে সঞ্চয় নয়, টিকে থাকার হিসাব করছে। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে দ্বিধায়, কারণ বাজারে অনিশ্চয়তা বেশি। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ আমদানি ব্যয় বাড়াচ্ছে, যা আবার দ্রব্যমূল্যে প্রভাব ফেলছে।
বর্তমানে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট এই দ্রব্যমূল্যর উচ্চ হার। শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, বাজার সিন্ডিকেট, আমদানি খরচ—সব একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ধরা যাক, ঢাকার এক রিকশাচালক রহিম প্রতিদিন আয় করেন ৭০০-৮০০ টাকা । কয়েক বছর আগে এই আয় দিয়ে তার পরিবার চলত, এখন চাল, তেল, ডাল কিনতেই কষ্ট হচ্ছে। অর্থনীতির বড় সূচক নয়—এই বাস্তব জীবনের চাপই সরকারের নীতির সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করে। এক্ষেত্রে বাজার মনিটরিং শক্তিশালী করা, কৃষিপণ্যের সরাসরি সরবরাহ চেইন উন্নত করা এবং আমদানি শুল্ক সাময়িক সমন্বয় কার্যকর হতে পারে । এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার চাইলে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে পারে। বাজার মনিটরিং শক্তিশালী করা, খাদ্য সরবরাহ চেইন উন্নত করা এবং ডলারের বিনিময় হার বাস্তবসম্মত করা—এই তিনটি সিদ্ধান্তই দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে। মানুষ যখন বাজারে গিয়ে দেখে দাম স্থিতিশীল, তখন সরকারের প্রতি আস্থা বাড়ে—এটি অর্থনীতির মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা ।
দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা। নিরাপত্তাহীনতা শুধু অপরাধের বিষয় নয়—এটি বিনিয়োগ, সামাজিক স্থিতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও যুক্ত। যখন মানুষ মনে করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নিরপেক্ষ নয়, তখন রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস কমে যায়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পুলিশ বাহিনীর প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠন। বাংলাদেশ পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে পেশাদারিত্ব বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। থানাকে সেবাকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা গেলে সাধারণ মানুষের ধারণা বদলাতে শুরু করবে।
এখানে বিদেশি উদাহরণ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে । ১৯৯০-এর দশকে সিংগাপুর দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতা মোকাবিলায় কঠোর নীতি নেয়—উচ্চ বেতন, কঠোর জবাবদিহি এবং শাস্তির নিশ্চয়তা। ফলাফল ছিল দ্রুত প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি ও বিনিয়োগে আস্থা তৈরি। আবার গণহত্যার ভয়াবহতা থেকে উঠে এসে রুয়ান্ডা আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে আফ্রিকার দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির একটি উদাহরণ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় শঙ্খলা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, এই দুই বিষয় সেখানে পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি ছিল ।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় দক্ষিণ কোরিয়ায়। ১৯৯৭ সালের এশীয় অর্থনৈতিক সংকটের পর তারা ব্যাংকিং সংস্কার, শিল্প পুনর্গঠন এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ায়। শিক্ষা হলো—সংকট অস্বীকার নয়, বরং দ্রুত সংস্কারই পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি করে ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও করণীয় স্পষ্ট। প্রথমত, ব্যাংকিং খাত সংস্কার— খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করতে হবে। তৃতীয়ত, কর্মসংস্থান ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ ও নীতি সহায়তা দিতে হবে। চতুর্থত, প্রশাসনে জবাবদিহি দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে প্রযুক্তি ব্যবহার বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ডিজিটাল অভিযোগ ব্যবস্থা, বডি ক্যামেরা, স্বচ্ছ তদন্ত প্রক্রিয়া—এসব ব্যবস্থা পুলিশের প্রতি আস্থা বাড়ায়। মানুষ যখন দেখে অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধটাই বিচার হচ্ছে—তখন রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস জন্মায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক বার্তা সরকার যদি শুরুতেই ঘোষণা করে— 'আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়' এবং সেটি বাস্তবে প্রমাণ করে, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে। সংকটের সময় মানুষের প্রত্যাশা কম থাকে, কিন্তু দৃশ্যমান পরিবর্তন হলে আস্থা দ্রুত বাড়ে ।
নতুন সরকারের সামনে বাস্তবতা কঠিন, কিন্তু সুযোগও বড়। অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক সংস্কারে সমন্বিত পদক্ষেপ নিলে কয়েক বছরের মধ্যেই ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা সম্ভব। রাষ্ট্রের ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আসে, যখন সিদ্ধান্তই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে—এটি তেমনই একটি সময় । জনগণ এখন প্রতিশ্রুতি নয়, প্রমাণ দেখতে চায়। আর প্রমাণ শুরু হয় প্রথম সিদ্ধান্ত থেকেই ।
লেখক : প্রধান বার্তা সম্পাদক, বাংলা টিভি ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব)