সুন্দরবনের সংলগ্ন বঙ্গপোসাগরে নতুন করে বনদস্যু ও জলদস্যু গ্রুপগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন সুন্দরবনের জেলেরা। এরই সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে দফায় দফায় জেলেদের অপহরণের ঘটনার পর সাগরে মাছ ধরা বন্ধ রেখেছেন জেলেরা। হাজারো জেলে অবস্থান নিয়েছেন সুন্দরবন সংলগ্ন দুবলারচরে।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যার দিকে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওই এলাকার জেলেরা সাগরে মাছ ধরা বন্ধ রেখেছেন বলে জানিয়েছেন। এর আগে মঙ্গলবার থেকে দুবলারচরের সহস্রাধিক শুঁটকিকরণ জেলে সাগর ও সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রেখে চরে অবস্থান নেন।
তারা জানান, গত শনিবার ও সোমবার জেলেদের অপহরণের পৃথক দুটি ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে সোমবার দিবাগত রাতে বঙ্গোপসাগরের নারিকেলবাড়ীয়া ও আমবাড়ীয়ার খাড়ি এলাকা থেকে তাদের অপহরণের ঘটনা ঘটে। শনিবার পূর্ব সুন্দরবনের শেলারচর এলাকায় বনরক্ষীদের টহল ফাঁড়ি সংলগ্ন একটি জেলেপল্লি থেকে অস্ত্রের মুখে ছয়জনকে অপহরণ করা হয়। মূলত গত ৬ মাস ধরেই বিক্ষিপ্তভাবে অপহরণের ঘটনা ঘটছে। এই পরিস্থিতিতে জলদস্যু ও বনদস্যুদের আতঙ্কে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে সাগর ও সুন্দরবনের বিভিন্ন নদীতে মাছ ধরা বন্ধ করে দিয়ে দুবলারচরে অবস্থান নেন জেলেরা। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় বনবিভাগ রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কায় রয়েছে।
দুবলা ফিসারমেন গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বুধবার দুপুরে দুবলার আলোরকোল থেকে মোবাইল ফোনে বলেন, সুন্দরবন ও সাগরে নিরাপত্তার অভাবে বনদস্যুদের হাতে অপহরণের আতঙ্কে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে জেলেরা মাছ ধরা বন্ধ রেখেছেন। জেলেরা এখন চরে অলস সময় কাটাচ্ছেন। মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে সুন্দরবনে জাহাঙ্গীর, সুমন, শরীফ ও করিম বাহিনী নামে চারটি বনদস্যু গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। দস্যুরা জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করছে। যারা টাকা দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন, তাদের ওপর চালানো হচ্ছে নির্যাতন। গত সপ্তাহে দস্যুদের মারধরে গুরুতর আহত চার জেলে রামপাল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
এর আগে ২০১৮ সালে তৎকালীন সরকার সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করেছিল। এরপর কয়েক বছর জেলেরা নিরাপদে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করলেও সম্প্রতি আবারও দস্যুদের তৎপরতা বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জেলে নেতারা।
আলোরকোলের রামপাল জেলে সমিতির সভাপতি মোতাসিম ফরাজী বলেন, ‘আগে প্রবাদ ছিল— জলে কুমির, ডাঙ্গায় বাঘ; এখন এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সাগরে গেলে ডাকাত।’ তিনি আরও জানান, গত ১৫ দিনে বহু জেলে অপহৃত হয়েছেন। বর্তমানে অন্তত শতাধিক জেলে দস্যুদের কবজায় রয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। সোমবার রাতে ২০ জেলেকে অপহরণের সময় দস্যুরা যোগাযোগের জন্য একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে গেছে। কিন্তু দুই দিন পার হলেও তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
শেলারচরের মৎস্য ব্যবসায়ী আরিফ হোসেন মিঠু জানান, বনদস্যুরা মোবাইল ফোনে বিভিন্ন জেলে ঘর থেকে প্রতি ঘরে এক লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ-এর জেলেপল্লী দুবলা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্ট রেঞ্জার মিলটন রায় বলেন, দস্যু আতঙ্কে জেলেরা মাছ ধরা বন্ধ রাখায় রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
একই বিভাগের শরণখোলা ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা ফরেস্ট রেঞ্জার মো. খলিলুর রহমান জানান, বনদস্যু আতঙ্কে কোনো জেলে সুন্দরবনে মাছ ধরার পাস নিচ্ছেন না। ফলে মাসিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় প্রভাব পড়ছে।
শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনে বনদস্যুদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বনরক্ষীরা জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছেন।