ভাষা আমাদের ঐক্য ও আত্মপরিচয়ের অংশ

এক কবি প্রশ্ন রাখিয়াছিলেন- 'একবার ভেবে দেখ মন, পৃথিবীতে পাখি কেন গায়।' পাখির গান কেবল নান্দনিকতার বিষয় নহে-ইহা তাহাদের অস্তিত্বের উপকরণ। বিজ্ঞান আমাদের জানায়, কূজনের ভিতর দিয়াই পাখি বিপৎসংকেত দেয়, সঙ্গী আহ্বান করে, বংশবৃদ্ধির আয়োজন সম্পন্ন করে। অতএব গান তাহাদের সামাজিক চুক্তি, যোগাযোগের সেতু, জীবনের পরম প্রয়োজন। এখন যদি কোনো প্রজাতি সেই গানই ভুলিয়া বসে, তাহা হইলে তাহাদের পরিণাম কী হইতে পারে? দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ার 'রিজেন্ট হানিইটার' একদা ছিল গায়ক পাখি। আজ তাহাদের সংখ্যা নামিয়া আসিয়াছে তিন শতকের ঘরে। গবেষণায় দেখা গিয়াছে, বিচ্ছিন্নতা ও সংখ্যা-হ্রাসের ফলে কচি পাখিরা আর প্রাচীন সুর শিখিতে পারিতেছে না; তারা ভুল সুরে গান গায়, কখনো-বা একেবারেই গায় না। ফলত সঙ্গী নির্বাচন ব্যাহত হয়, প্রজনন সংকুচিত হয়, প্রজাতি আরো বিপন্নতায় পতিত হয়। প্রশ্ন জাগে-বিপন্নতার ফলে কি গান হারাইল, নাকি গান হারানোর কারণেই বিপন্নতা? সমীকরণ যাহাই হউক, একটি সত্য স্পষ্ট: ভাষাহীনতা অস্তিত্বকে দুর্বল করে।

কোনো জাতি যদি আপন ভাষায় কথা বলিবার ক্ষমতা হারায়, তাহা হইলে তাহার চিন্তার স্বাভাবিক প্রবাহ স্তব্ধ হয়, আত্মপরিচয় শিথিল হয়, সামাজিক সংহতি ভাঙিয়া পড়ে। আবার ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-যখন কোনো জাতিকে অন্তঃসলিলার মতো নিঃশব্দে বিপন্ন করিবার প্রয়াস চলে, তখন প্রথম আঘাত হানে তাহার ভাষার উপর। মাতৃভাষা মানুষের চিন্তা-চেতনার প্রাথমিক অবলম্বন। মনোবিজ্ঞান ও ভাষাতত্ত্ব বলিয়া থাকে, শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশ মাতৃভাষার ভিতর দিয়াই সর্বাধিক স্বাভাবিক রূপে ঘটে। মাতৃভাষায় শিক্ষা সৃষ্টিশীলতা বৃদ্ধি করে, আত্মবিশ্বাস জাগায়, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি সুদৃঢ় করে। বিপরীতে, ভাষাগত বিচ্ছিন্নতা মানসিক চাপ, আত্মপরিচয়ের সংকট এবং সামাজিক বিভাজন সৃষ্টি করে। যাহারা আপন ভাষা বিসর্জন দিয়া অন্য ভাষায় আত্মগোপন করে, তাহারা কোনো এক সংকীর্ণ শ্রেণির সহিত যুক্ত হইতে পারিলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সহিত সংযোগ হারায়।

ভাষা কেবল শব্দের সমষ্টি নহে-ইহা ইতিহাস, প্রবাদ, লোককথা, সংগীত, সাহিত্যের আধার। পৃথিবীর প্রায় ৭ হাজার ভাষার মধ্যে বহু ভাষাই বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। ভাষাবিদদের পূর্বাভাস-পরবর্তী এক শত বৎসরে সহস্রাধিক ভাষা হারাইয়া যাইবে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন প্রমাণ করিয়াছে, মাতৃভাষার প্রশ্নে আপস মানে আত্মসমর্পণ। সেই সংগ্রামই পরবর্তীকালে স্বাধীনতার প্রেরণা জুগাইয়াছে। এই ভাষার জন্য আত্মদান বিশ্বে বিরল উদাহরণ: এই কারণেই একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পাইয়াছে।

তথাপি আধুনিক কালে আমরা এক নূতন সংকট প্রত্যক্ষ করি। প্রযুক্তির প্রারম্ভিক সীমাবদ্ধতায় বাংলা হরফে লিখিবার সুবিধা না থাকায় রোমান হরফে বাংলা লেখার অভ্যাস গড়িয়া উঠিয়াছিল। পাকিস্তান আমলে আরবি বা রোমান হরফে বাংলা লেখার যে অপপ্রয়াস চলিয়াছিল, তাহা ব্যর্থ হইয়াছিল জনমতের দৃঢ়তায়। কিন্তু ইতিহাসের পরিহাস-ডিজিটাল যুগে অজ্ঞতা ও সুবিধাবাদের কারণে আমরা নিজেরাই কখনো কখনো সেই পথ অবলম্বন করি।

অবশ্য প্রযুক্তিই আজ মুক্তির দ্বারও উন্মুক্ত করিয়াছে। ইউনিকোড, বাংলা কীবোর্ড, অভ্র কিংবা জি-বোর্ডের উচ্চারণভিত্তিক পদ্ধতি-সবই বাংলাকে সহজলভ্য করিয়াছে। অতএব অজুহাতের অবকাশ ক্রমশ সংকুচিত। বাংলা বাক্য বাংলার বর্ণেই লিখিব-ইহা কেবল রুচির প্রশ্ন নহে, দায়িত্বের ও প্রশ্ন।
বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজি বা অন্যান্য ভাষা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই প্রয়োজন যেন মাতৃভাষাকে অবমূল্যায়নের অজুহাত না হয়। ফ্রিডরিখ শিলার সতর্ক করিয়াছেন-যে জাতি আপন ভাষা রক্ষা করিতে পারে না, সে জাতি আপন সত্তা রক্ষা করিতেও ব্যর্থ হয়। বাংলা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মাতৃভাষা-তথাপি প্রতিযোগিতার যুগে ইহার মর্যাদা সুসংহত রাখিবার জন্য প্রয়োজন সচেতন চর্চা, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত অভিযোজন।
রিজেন্ট হানিইটারের করুণ কাহিনি আমাদের প্রতীক দিয়া শিক্ষা দেয়। গান হারাইলে পাখি সঙ্গী হারায়, সঙ্গী হারাইলে প্রজাতি লুপ্ত হয়। সুতরাং বাংলা ভাষাকে প্রযুক্তির সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ করিয়া, দৈনন্দিন চর্চায় শুদ্ধভাবে ব্যবহার করিয়া, আগামী প্রজন্মের নিকট সজীব রাখাই আমাদের কর্তব্য।