শ্রেষ্ঠত্বের কলঙ্কের দূষণ আর কত ছড়াইবে?

 ‘আমিই শ্রেষ্ঠ, আমার বর্ণ, উচ্চতা, ভাবনা—সকল কিছুই শ্রেষ্ঠত্বের কষ্টিপাথরে উত্তীর্ণ’—ইহার চাইতে দূষিত ভাবনা আর হইতে পারে না। দুঃখের বিষয় হইল, বিশ্বব্যাপী এই আমিত্ব এবং শ্রেষ্ঠত্বের ভাবনার ভাইরাস ছড়াইয়া পড়িতেছে আগের চাইতে অনেক বেশি মাত্রায়।

ক্ষমতার মোহে যখন বিশ্বের কিছু নেতা দায়িত্বহীন হইয়া পড়েন, ছড়াইতে থাকেন বর্ণবাদী শ্রেষ্ঠত্বের জীবাণু—তখন অগ্নিময় বিশ্বের গর্ভে আরো বেশি ঘি ঢালা হয়। ইহার পরিণতিতে যাহা হয়, তাহারই প্রকাশ ঘটিতেছে পরাশক্তি একটি দেশের এক শ্রেষ্ঠত্ববাদী নেতার নূতন জামানায়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের দুইটি অঙ্গরাজ্যে এক বন্দুকধারীর এলোপাতাড়ি গুলিতে প্রাণ হারাইয়াছেন ২৯ জন। আহতের সংখ্যা ৪০ জনের বেশি। টেক্সাসের দোকানে হামলার ১৩ ঘণ্টার মাথায় স্থানীয় সময় রাত ১ টার দিকে ওহাইও অঙ্গরাজ্যের অরেগনের ডেটনে একটি পানশালার বাহিরে একই ধরনের ঘটনা ঘটে। টেক্সাসের হামলাকারী প্যাটট্রিক ক্রুসিয়াস হামলার কিছুক্ষণ পূর্বে দেওয়া ২৩ শত শব্দের মেন্যুফেস্টোতে লিখিয়াছে— হিস্পানিয়ানরা দখল করিয়া লইতেছে টেক্সাস। শ্বেতাঙ্গরা ভূমি হারাইতেছে ভিনদেশিদের নিকট। আমরা যদি ভিনদেশিদের হটাইতে পারি, তবে আমাদের জীবন আরো বেশি স্থিতিশীল হইবে।

বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় যে, প্যাটট্রিক ক্রুসিয়াস সমর্থন করিয়াছে ক্রাইসচার্চের অতি উগ্র হামলাকারীকে। স্পষ্টতই, এই মেনুফেস্টোর মাধ্যমে প্যাটট্রিক যেই শ্রেষ্ঠত্বের অহম এবং হিংসা প্রকাশ করিয়াছে, তাহার বিষাক্ত বীজ ছড়াইয়াছেন কিছু কিছু উগ্রবাদী নেতা। দুঃখের সহিত বলিতে হয় যে, ক্ষমতায় যাওয়া এবং টিকিয়া থাকাই যখন কোনো নেতার প্রধানতম উদ্দেশ্য হয়, তখন এই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়াটা অস্বাভাবিক নহে। কারণ, সাধারণ বর্ণবাদীরা বড়ো বড়ো রাজনীতিকদের নিকট হইতে এই ধরনের উসকানি পাইলে হিংসার বিস্তার লাগামছাড়া হইয়া পড়ে। বিশ্লেষকরা দেখিয়াছেন যে, পনেরো শতক হইতে এখন অবধি বড়ো বড়ো গণহত্যা এবং বর্ণবাদী কর্মকাণ্ডগুলির বেশিরভাগই ছিল শ্রেষ্ঠত্বের অভিযানের অংশ। ইহার নেপথ্যে রহিয়াছে ‘লেবেনস্রাম’-এর মনস্তত্ত্ব। ইহা হইল ‘লিভিং স্পেস’, যাহাকে বলা হয় কোনো রাষ্ট্রের বিবেচনায় তাহার সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় এলাকা। এই ব্যাপারে জার্মান ভৌগোলিক ও প্রাণিতত্ত্ববিদ ফ্রেডরিক রাটজেল মনে করেন, শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা শুধু স্থানের খোঁজেই সাম্রাজ্য বিস্তার করিবে না, বরং ইহা করিবে তাহাদের টেকসই জীবনধারণের জন্য। এই কারণে শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা মনে করেন, অধিকতর শক্তিশালী জাতির বিস্তারের জন্য দুর্বলরা অবশ্যই পথ ছাড়িয়া দিবে অথবা তাহাদের পথ ছাড়িয়া দিতে বাধ্য করা হইবে।

প্রকৃতপক্ষে নিজেদের শ্রেষ্ঠ মনে করাটাই একটি অশ্রেষ্ঠত্বের কাজ। যাহারা নিজেদের শ্রেষ্ঠবাদী বলিয়া মনে করিয়া অন্যের উপর হিংসার বিষবাষ্প ছড়াইতে চাহে, অন্যরাও যদি নিজেদের রক্ষার জন্য পালটা হিংসার পথ বাছিয়া লয়—তাহা হইলে বিশ্ব কি আরো অস্থির হইয়া উঠিবে না? সুতরাং দর্পণে নিজেদের মুখ দেখিতে হইবে শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের। উপলব্ধি করিতে হইবে—শ্রেষ্ঠত্বের কলঙ্কে যেন আর দূষিত না হয় এই বিশ্ব।