সবুজ কারখানা—কতটুকু সবুজ বিপ্লব

বকুল আশরাফ

আমরা হুজুগে বাঙালি। একজনকে দেখে অনুসরণ করা শুরু করি। ভালোমন্দ বিচারের দায়ভার ছেড়ে দেই ভবিষ্যতের হাতে। এভাবেই একদিন শুরু হয়েছিল এদেশে তৈরি পোশাকশিল্প কারখানা। কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাই না করেই তৈরি পোশাকশিল্প শুরু করে দিয়েছিলেন উদ্যোক্তারা। ফল খারাপ হয়নি। আজ বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩৫ বিলিয়িন ডলার রপ্তানি হয় পৃথিবীর শতাধিক দেশে। সুনামও বেড়েছে দেশের। তৈরি পোশাকের কোয়ালিটিও ইউরো-আমেরিকান বাজারে প্রতিযোগিতায় শীর্ষস্থানেই অবস্থান করছে। বিশ্বের বড়ো বড়ো খ্যাতিসম্পন্ন ব্র্যান্ডগুলো এর ক্রেতা। শুরুটা ছিল গত শতকের আট দশকের শেষ প্রান্তে। ‘স্মল এন্ড কটেজ ইন্ডাস্ট্রি’ হিসেবে। আজ এক একটি ক্ষুদ্র কারখানা বিশাল গ্রুপে উন্নীত। কর্মসংস্থান হয়েছে ৪০ লাখের অধিক কর্মীর। পাশাপাশি গড়ে উঠেছে ছোটো-বড়ো এক্সেসরিজ কারখানা। এভাবেই চলছিল। হঠাত্ করে রানা প্লাজার ভেঙে পড়া এবং তাজরিন কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১ হাজারের অধিক শ্রমিক নিহত হবার ফলে পৃথিবীব্যাপী শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় বাংলাদেশের পোশাকশিল্প কারখানাকে। ভাবমূর্তি হারাতে হয়। এরপরই শুরু হয় শ্রমিকদের নিরাপত্তা বা কর্মসংস্থায় নিরাপদ পরিবেশ নামে বিশাল কর্মযজ্ঞ। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে ফায়ার সেইফটি, ইলেকট্রিক্যাল সেইফটি ও বিল্ডিং সেইফটির প্রয়োজনে। নিরাপত্তার কথা এবং কর্ম পরিবেশের কথা বিবেচনায় নিয়ে হঠাত্ করেই তৈরি পোশাক শিল্প বাঁক নেয় ‘সবুজ কারখানা’র দিকে। ক্রেতাদের কাছ থেকে ভালো মূল্য পাবার আশ্বাসে সর্বপ্রথম ২০১২ সালে একটি গ্রিন ফ্যাক্টরি গড়ে উঠে। শুরু হয় এর প্রচার এবং প্রসার। বর্তমানে প্রায় অর্ধশতাধিক সবুজ কারখানা গড়ে উঠেছে এই দেশে এবং যতদূর জানা যায় যে, প্রায় ২ শতাধিক কারখানা নির্মাণাধীন। দেখা যাচ্ছে ২০২০ নাগাদ প্রায় ৩০০ সবুজ কারখানা বা তৈরি পোশাক শিল্প গড়ে উঠবে। যদি এমনটাই হয় তবে বিশ্বে তৈরি পোশাক খাতে সবচেয়ে সবুজ পরিবেশবান্ধব কারখানার দেশ হবে বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে আমরা জেনেছি যে, পৃথিবীর শীর্ষ ১০টি পরিবেশবান্ধব তৈরি পোশাক পণ্য উত্পাদনকারী কারখানাসমূহের মধ্যে ৭টি বাংলাদেশে স্থাপিত। জরিপটি করেছে ‘লিড’ সনদ প্রদানকারী ইউএসজিবিসি (ইউ এস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল)। ‘লিড’ হচ্ছে ‘লিডারশিপ ইন অ্যানার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন’। এই সনদ থেকেই স্পষ্টত ধরে নেওয়া যায় নিরাপত্তার পাশাপাশি জোর দেওয়া হচ্ছে পরিবেশের ওপর।

বর্তমানে পুরো পৃথিবীর জনপদ পরিবেশ নিয়ে ভাবিত এবং উদ্বিগ্ন। অর্থাত্ পরিবেশ রক্ষায় উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ কারখানার উদ্যোক্তাদের পৃথিবীব্যাপী বদনাম রয়েছে পরিবেশ ধ্বংসকারী হিসেবে, সবুজ ধ্বসকারী হিসেবে। আমরা জানি, পরিবেশ বা প্রকৃতির বিশাল অংশই সবুজ দ্বারা বেষ্টিত। তাই চারপাশ সবুজ বা বনায়ন করে রাখার প্রবণতা বাড়ছে। বর্তমানে এই সবুজ কারখানার কনসেপ্ট পালটে দিচ্ছে তৈরি পোশাক শিল্পের অতীতের ধারাকে। একসময় ছোটো ঘরে, খুপরিতে বা আবাসিক বাড়িতে গড়ে উঠা তৈরি পোশাক কারখানা তার ধরণ পালটাচ্ছে। পালটাচ্ছে বলতে বুঝাচ্ছি পরিসর বাড়িয়েছে। প্রথমবার পরিসর পালটে ছিল স্থানিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে। বর্তমানে পালটাচ্ছে প্রতিবেশের ধারণা মাথায় নিয়ে। আর এ ধারণা একজন প্রতিযোগী উদ্যোক্তার কারখানা নির্মাণব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে কয়েক গুণ। বর্তমান প্রবৃদ্ধিকে মাথায় রেখে এই ব্যয় বাড়ছে এবং সৃষ্টি হচ্ছে সবুজ কারখানা বা সবুজ বিপ্লবের সূচনা। আমরা অনেকেই ধারণা করছি—পরিবেশবান্ধব এ বিপ্লবের মাধ্যমে এই পোশাক খাত নতুন এক উচ্চতা ছুঁয়ে যাবে। আরো ভাবছি এই সবুজ কনসেপ্ট বুঝি বিদেশি ক্রেতাদের নতুন করে আকৃষ্ট করবে। হয়তো এই কর্মক্ষেত্রে সৃষ্টি হবে আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা। আমরা ধরে নিতে পারি, পোশাক খাতের দুর্নাম ঘোচানোর চেষ্টার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ‘ইউনাইটেড স্টেটস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল’ থেকে ধারণা নিয়ে বা কনসালটেন্ট নিয়োগ দিয়ে, তাদের সহায়তায় তৈরি হচ্ছে সবুজ কারখানা। কিছু শর্ত মেনে নিয়ে তৈরি হওয়া এই শিল্পকে এগিয়ে যেতে হবে। শর্তগুলো হলো—কারখানা ভবনের ভেতরে প্রাকৃতিক আলো ও বাতাসের সুব্যবস্থা থাকতে হবে, আধুনিক মেশিনারিজ স্থাপন করতে হবে, পর্যাপ্ত জমির ওপর নির্মিত হতে হবে এই কারখানা, কারখানার চারপাশে থাকতে হবে গাছগাছালিসহ কৃত্রিম লেক বা ফোয়ারা, থাকতে হবে খোলামেলা পরিবেশ, থাকতে হবে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ সুয়োগ-সুবিধা অর্থাত্ শক্তিশালী আধুনিক সেইফটি ডিভাইজসহ আগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, এক শ্রমিক থেকে অন্য শ্রমিকের নির্দিষ্ট একটি দূরত্ব মেনে চলতে হবে। শ্রমিকদের আবাসন ব্যবস্থাসহ যাতায়াতের জন্য বিশেষ ধরনের সুবিধা থাকতে হবে, থাকতে হবে লাইফস্টাইল সেন্টার, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সুবিধাদি। থাকতে হবে এনার্জি সেভ করার প্রক্রিয়া, যা দৈনন্দিন উপাত্ত সংগ্রহের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ করে রাখতে হবে, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহার করতে হবে। অর্থাত্ আগামী প্রজন্মের জন্য প্রকৃতিকে সুরক্ষা রাখা একটি প্রধান শর্ত। এবং এসব শর্ত প্রমাণ করে এই ধরনের সবুজ কারখানার নির্মাণ ব্যয় অত্যধিক। আমাদের মনে রাখতে হবে—এসব শর্ত মেনে চলার শলাপরামর্শ কিন্তু দিয়েছে ইউএসজিবিসি, তাদের এই ব্যয়বহুল শর্তপূরণ করে অসাধ্য সাধন করলেই সনদ পাওয়া সম্ভব।  মনে রাখতে হবে যে, কারখানা শুরুর দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত কার্যপ্রণালি পরিচালনার শতভাগ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলতে হবে।

সামাজিকভাবেই বাংলাদেশের মানুষ সংগ্রাম করে জীবনযাপন করে অভ্যস্ত। এদেশের মানুষ বন্যায় প্লাবিত হয়, তবুও বেঁচে থাকে। অতিবৃষ্টিতে ফসল বিনষ্ট হয়, বৃষ্টির পানি সরে গেলে আবার নতুনভাবে চাষাবাদে ভরে ফেলে ফসলি জমি—এভাবে সারা দেশের মানুষের জন্য খাদ্যের যোগান দেয় কৃষক। আসলে এদেশের মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে জানে। উদাহরণটা হয়তো ক্ষুদ্রকার বা মাইক্রো স্কেলের হয়ে গেল; কিন্তু ম্যাক্রো স্কেলেও সম্ভব, শুধু দরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা। রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর এদেশের এবং দেশের পোশাক তৈরি শিল্পের বিশ্ববাজারে যে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছিল তা রুখে দিয়েছে তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার সুব্যবস্থা করে এবং পরবর্তী সময়ে সবুজ বিপ্লব ঘটিয়ে। এমনিতেই হিমশিম খাওয়া তৈরি পোশাক খাত বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে। বর্তমানে একটি সবুজ কারখানা তৈরি ব্যয় হচ্ছে ৩০০ কোটি থেকে হাজার কোটি পর্যন্ত। এই যে ব্যয়ের ওপর নির্ভরতা এটাকি সত্যিকারার্থে লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারবে! পারবে কি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিতে! এই সবুজ যাত্রা কতটুকু সবুজ থাকবে তা নির্ধারণ করবে আগামী।

n লেখক : কবি ও প্রবন্ধিক