মানব পাচারের লাগামহীন ঘোড়া থামাতে হবে

আরজু আফরিন ক্যাথি

বিপজ্জনক উপায়ে মানব পাচার যে থেমে থাকেনি তার সর্বোত্কৃষ্ট উদাহরণ হলো গত কদিন আগে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে বাংলাদেশি নাগরিক বহনকারী একটি ট্রলারের ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ডুবে যাওয়া। মানব পাচার মামলা মীমাংসার হার সর্বনিম্ন হওয়ায় বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক পাচারকারীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে।   

যে কোনো দেশের গঠনতন্ত্র এবং সংবিধান অনুযায়ী সব ধরনের বাধ্যতামূলক শ্রম ও পতিতাবৃত্তি থেকে নাগরিকদের রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে মানব পাচারের মতো একটি আন্তঃদেশীয় অপরাধকে ঠেকিয়ে ভুক্তভোগীদের উদ্ধার করা কঠিন থেকে কঠিনতম হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে। 

দক্ষিণ এশিয়ায়  মানব পাচার বছরে দেড় হাজারেরও বেশি লোককে প্রভাবিত করে বলে অনুমান করা যায়। বেশিরভাগ মহিলা এবং শিশু যাদেরকে শ্রম এবং যৌন ব্যবসায়ের জন্য শোষণ করা হয়। মানব পাচার সরাসরি তিনটি পৃথক স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে সম্পর্কিত:ভুক্তভোগী, নিষ্ঠুর পাচারকারী এবং ক্রেতা যারা পাচার হওয়া লোকদের কিনছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে, পাচারকারীরা শিশু এবং মহিলা যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে তাদের টার্গেট করে পাচার করছে। যেটি কিনা একটি সমাজের দুর্বল অংশকে নির্দেশ করে। আমরা মানব পাচারের দুটি দিক পর্যবেক্ষণ করতে পারি। এমন অসংখ্য কারণ আছে যেগুলো অসহায় মানুষদের ঠেলে দিচ্ছে পাচারকারী চক্রগুলোর ফাঁদে পা ফেলতে। যেমন, আমাদের দেশের ২ মিলিয়ন মানুষ বা প্রায় ১০% জনসংখ্যার প্রতিদিনের আয় ১.৯৯ মার্কিন ডলারেরও কম, প্রায় ৪.৪ মিলিয়ন যুবক বাংলাদেশে বেকারত্বের মুখোমুখি, বাকস্বাধীনতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার অভাব, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বহু লোক প্রতিবছর শরণার্থী হচ্ছে  আর এই ভূমিহীনতা মানুষকে জীবিকা নির্বাহের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বা অবৈধ উপায় অবলম্বনে বাধ্য করছে, গ্রামীণ অঞ্চলে বাস করা মানুষের ঋণগ্রস্ততা, গুণগত শিক্ষার অভাব এবং চাকরির সুযোগের অভাব, শৈশবকালে মেয়েদের বিবাহ দেয়া এবং শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ছাড়াই বিবাহ বিচ্ছেদের ফলে নারী সমাজের নির্ভরশীলতা, বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ও পুরুষতন্ত্র, নারীর ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে অদৃশ্য গ্লাস সিলিং, বিদেশে যাওয়ার সময় প্রশাসনিক পদ্ধতির দীর্ঘসূত্রিতা এবং সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির উপস্থিতি। কখনো বা বিভিন্ন প্রলোভন যেমন:বিদেশে উচ্চমানের জীবনযাত্রা, ন্যায্য বেতনে চাকরির সুযোগ পাওয়া, বিশেষত স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় উন্নত নাগরিক সুযোগ-সুবিধা মানুষকে পাচারকারীদের সঙ্গে হাত মেলাতে প্ররোচিত করে। একইসঙ্গে  বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ১০ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য মানবপাচার একটি সদা বিরাজমান হুমকি কেননা এ জনগোষ্ঠী উন্মুখ হয়ে জীবিকার অন্বেষণে ঘুরছে। অসহায় সম্প্রদায়টি অপরাধমূলক পাচারকারী সিন্ডিকেটগুলোর জন্য একটি ঊর্বর ক্ষেত্র কেননা তাদেরকে সহজেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা সম্ভব।   

মানব পাচারের মতো একটি আন্তঃদেশীয় অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমাদের প্রয়োজন বহুমাত্রিক নীতিমালা। দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং বেকারত্ব কমিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকারকে যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণের প্রাপ্তি নিশ্চিত করে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে হবে। পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ অনুযায়ী, নির্ধারিত নির্দিষ্ট ট্রাইব্যুনালের অভাবের কারণে অধস্তন আদালত মামলাগুলো তদারকি করছে, যা আদালতে একটি ব্যাকলগ তৈরি করে। মানব পাচারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিকভাবে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।

মানব পাচার বিরুদ্ধ লড়াইয়ে প্রত্যেকটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অপরিহার্য। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন দেশের দূতাবাস এবং জনশক্তি, কর্মচারী ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) কাজের মধ্যে সামঞ্জস্যতা আবশ্যক। একজন শ্রমিককে ভিসা অনুমোদন করার পূর্বে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। পুরো প্রক্রিয়া জুড়ে দুর্নীতির বিষয়টি আমলে নেওয়া উচিত যাতে অবৈধ চ্যানেলগুলোর প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকে।  সরকারের আইনি অভিবাসন প্রক্রিয়াটি সহজতর করা উচিত এবং প্রশাসনের পদ্ধতিগত জঞ্জাল দূর করা উচিত।  নেটওয়ার্কিং এখানে অত্যন্ত  গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রতিরোধমূলক এবং তদন্তকারী সাংবাদিকতা প্রয়োজন যেন পাচারের জন্য লোকজন নিয়োগের সময় এই জাতীয় পাচারকারী সংস্থা ফাঁস হয়। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সেমিনার, সভা-সমিতি, আলোচনা সভার আয়োজন করা যেতে পারে। কেননা, একমাত্র ব্যক্তিগত সচেতনতাই পারে মানব পাচারের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনতে। অভিবাসন আমাদের অংশ, আমাদের ইতিহাসের একটি অংশ। আমরা কখনোই মানুষের চলাচল বন্ধ করতে পারি না। তাইতো, উপরোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করলে আশা করা যায়,  অভিবাসনের মতো স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি কাঁটাবিহীন, বিশ্বাসযোগ্য এবং নিরাপদ হবে । 

n লেখক :শিক্ষার্থী, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়