১। ভূমিকা: ভৌগোলিক বাস্তবতা ও প্রকৃতির খেয়ালি আচরণ বাংলাদেশকে বিশ্বের মানচিত্রে অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র- মেঘনাবিধৌত এই বদ্বীপ রাষ্ট্রটি তার জন্মলগ্ন থেকেই প্রকৃতির রুদ্ররোষের সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে আছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, আকস্মিক বন্যা, নদীভাঙন, খরা, ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং সাম্প্রতিক কালের বজ্রপাত —সব মিলিয়ে দুর্যোগ এ দেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী। ‘গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স' বা বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান সব সময়ই শীর্ষসারির দেশগুলোর মধ্যে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেবল কোনো সাধারণ প্রশাসনিক রুটিন কাজ নয়; বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনজীবনের অস্তিত্ব রক্ষার এক অনিবার্য সংগ্রাম। দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের বেসামরিক প্রশাসনের পাশাপাশি যে প্রতিষ্ঠানটি 'ফ্রন্টলাইন ডিফেন্ডার' বা সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে কাজ করে, তা হলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। শৃঙ্খলা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, আধুনিক সরঞ্জাম এবং দেশপ্রেমের সমন্বয়ে সেনাবাহিনী দুর্যোগকালীন জনগণের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কাঠামো, ‘স্ট্যান্ডিং অর্ডারস অন ডিজাস্টার' (SOD)-এর আলোকে সেনাবাহিনীর ভূমিকা এবং ঐতিহাসিক ও সাম্প্রতিক বিভিন্ন দুর্যোগে তাদের অবদান অনস্বীকার্য।
২। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ধারণা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বলতে কেবল ত্রাণ বিতরণ বোঝায় না। এটি একটি সমন্বিত বিজ্ঞান ও কলাকৌশল, যার মাধ্যমে প্রাণহানি কমানো, সম্পদের সুরক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা হয়। আধুনিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার চক্রটি প্রধানত চারটি ধাপে বিভক্ত:
ক। প্রশমন ও প্রতিরোধ ( Mitigation & Prevention)
খ। প্রস্তুতি (Preparedness ) গ। সাড়াদান (Response)
ঘ। পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন ( Recovery & Rehabilitation)
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ, এ দেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। ফলে ছোট কোনো দুর্যোগও বড় মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দুর্যোগের ধরন পালটাচ্ছে। উপকূলীয় জলোচ্ছ্বাসের পাশাপাশি এখন শহরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা, ভবন ধস এবং অগ্নিকাণ্ডের মতো মানবসৃষ্ট দুর্যোগও ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৩। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার আইনি কাঠামো ও সেনাবাহিনী ": বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মূল নির্দেশিকা হলো ‘দুর্যোগ বিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি' বা Standing Orders on Disaster (SOD )। এই দলিলে দুর্যোগের সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত কার কী দায়িত্ব, তা স্পষ্টভাবে বলা আছে। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ (Armed Forces Division-AFD)-এর অধীনে সেনাবাহিনী মূলত 'সিভিল প্রশাসনকে সহায়তা' (Aid to Civil Power ) প্রদানের নীতিতে কাজ করে।
৪। দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বহুমাত্রিক ভূমিকা: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা কেবল উদ্ধারকাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুর্যোগের প্রতিটি ধাপে তাদের বিচরণ রয়েছে।
ক। দুর্যোগপূর্ব প্রস্তুতি ও ঝুঁকি হ্রাসকরণ: দুর্যোগ আঘাত হানার আগেই সেনাবাহিনী তাদের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করে। এর মধ্যে রয়েছে:
(১) সতর্কীকরণ ও যোগাযোগ: উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত প্রচার এবং দুর্গম চরাঞ্চলে যেখানে সাধারণ যোগাযোগব্যবস্থা নেই, সেখানে সেনাবাহিনীর নিজস্ব রেডিও নেটওয়ার্ক ও সিগন্যাল কোরের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করা হয়।
(২) মহড়া ও প্রশিক্ষণ: নিয়মিতভাবে দুর্যোগ মোকাবিলার মহড়া আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার জন্য ট্রুপস বা সৈন্যদের প্রস্তুত রাখা হয়।
(৩) কৌশলগত মজুত: জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য রেশনিং, তাঁবু, লাইফ জ্যাকেট এবং উদ্ধারকারী বোট আগে থেকেই কৌশলগত অবস্থানে মজুত রাখা হয়।
খ। দুর্যোগকালীন সাড়াদান (Emergency Response): দুর্যোগ আঘাত হানার পর প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা বা ‘গোল্ডেন আওয়ার' অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় সেনাবাহিনীর কার্যক্রমগুলো হলো:
(১) সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ( Search and Rescue ): এটি সেনাবাহিনীর সবচেয়ে দৃশ্যমান ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। ধসে পড়া ভবন, প্লাবিত এলাকা বা পাহাড় ধসের ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিতদের উদ্ধার করতে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর এবং কমান্ডোরা বিশেষ দক্ষতা প্ৰদৰ্শন করেন।
(২) লজিস্টিক সাপোর্ট বা রসদ সরবরাহ: যখন রাস্তাঘাট ডুবে যায় বা ভেঙে যায়, তখন সেনাবাহিনীর 'আর্মি এভিয়েশন গ্রুপ'-এর হেলিকপটার এবং নৌযানগুলো ত্রাণ পৌঁছানোর একমাত্র মাধ্যম হয়ে ওঠে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা বা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে আকাশপথে খাবার ও ওষুধ পৌঁছে দেয় তারা।
(৩) জরুরি চিকিৎসাসেবা: সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোর (Amy Medical Corps ) দুর্যোগকবলিত এলাকায় অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করে। আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া, মহামারি রোধে টিকা দেওয়া এবং বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করতে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন তাদের অন্যতম কাজ।
গ। দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন: দুর্যোগ চলে যাওয়ার পর শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি লড়াই। এখানে সেনাবাহিনী ‘নেশন বিল্ডিং' বা দেশগঠনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়:
(১) অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ: ভেঙে যাওয়া বাঁধ মেরামত, বিধ্বস্ত সড়ক যোগাযোগ সচল করতে বেইলি ব্রিজ (Bailey Bridge) স্থাপন এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
(২) আইনশৃঙ্খলা রক্ষা: দুর্যোগের পর অনেক সময় এলাকায় চুরির ঘটনা বা বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। সেনাবাহিনী টহল জোরদার করে জানমালের নিরাপত্তা বিধান করে।
(৩) আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা: ঘরহারা মানুষদের জন্য স্থাপিত অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে তারা কাজ করে।
৫। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও উল্লেখযোগ্য অপারেশনসমূহ: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গত পাঁচ দশকে অসংখ্য দুর্যোগে তাদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। কিছু উল্লেখযোগ্য অপারেশনের বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
ক। ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়: ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। সেই সময় যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সেনাবাহিনী তাদের 'অপারেশন সি গাল' ( Operation Sea Gull) এবং অন্যান্য কার্যক্রমের মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকায় মৃতদেহ দাফন, মহামারি রোধ এবং ত্রাণ বিতরণে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। এটি ছিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সেনাবাহিনীর সক্ষমতার প্রথম বড় পরীক্ষা।
খ। ঘূর্ণিঝড় সিডর (২০০৭) আইলা (২০০৯): সিডর এবং আইলা ছিল বাংলাদেশের উপকূলীয় অর্থনীতির জন্য বড় আঘাত। সেনাবাহিনী 'অপারেশন আশার আলো' নামে ব্যাপক উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করে। সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী দুর্গম এলাকাগুলোতে যেখানে সাধারণ ট্রলার যেতে পারত না, সেখানে সেনাবাহিনীর উভচর যান এবং হেলিকপটার জীবনরক্ষা করেছে। তারা হাজার হাজার ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ এবং সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেছিল।
গ। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি (২০১৩): এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না, কিন্তু এটি ছিল বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা। রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত উদ্ধার অভিযান চলে টানা তিন সপ্তাহ। কংক্রিটের জঙ্গল কেটে জীবিতদের বের করে আনা ছিল অত্যন্ত জটিল ও কারিগরি দক্ষতা সাপেক্ষ কাজ। সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সদস্যরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুড়ঙ্গ তৈরি করে ভুক্তভোগীদের উদ্ধার করেছিলেন, যা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছিল।
ঘ। পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড় ধস (২০১৭): ২০১৭ সালে রাঙ্গামাটিতে ভয়াবহ পাহাড় ধসে মাটিচাপা পড়া মানুষদের উদ্ধার করতে গিয়ে সেনাবাহিনীর দুই কর্মকর্তাসহ পাঁচ জন সদস্য শাহাদাতবরণ করেন। মেজর মাহফুজুল হক এবং তার সহযোদ্ধাদের এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে যে, দেশের মানুষের বিপদে সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত।
ঙ। কোভিড-১৯ মহামারি ( ২০২০-২০২১): করোনা ভাইরাস মোকাবিলার সময় সেনাবাহিনী এক ভিন্ন ধরনের ‘অদৃশ্য শত্রু'র বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। 'ইন
এইড টু সিভিল পাওয়ার'-এর আওতায় তারা সারা দেশে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণ, লকডাউন বাস্তবায়ন এবং কোয়ারেন্টাইন সেন্টার পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকা রাখে। ঢাকার আশকোনা হজ ক্যাম্প ও দিয়াবাড়ীতে কোয়ারেন্টাইন সেন্টার পরিচালনা এবং পরবর্তী সময়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে করোনার টিকা পরিবহনে তাদের লজিস্টিক সাপোর্ট ছিল অনবদ্য।
চ। সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যা (২০২২): ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় সিলেট ও সুনামগঞ্জ যখন বিদ্যুৎহীন ও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন সেনাবাহিনীই ছিল একমাত্র ভরসা। বন্যার্তদের উদ্ধার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের উদ্ধার এবং কুমারগাঁও বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বন্যার পানি থেকে রক্ষা করতে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের প্রাণপণ চেষ্টা ছিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
ছ। ঘূর্ণিঝড় মোখা (মে ২০২৩): বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় 'মোখা' মোকাবিলায় সেনাবাহিনী উপকূলীয় জেলাগুলোতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কক্সবাজার এবং সেন্ট মার্টিনে আটকে পড়া পর্যটক ও স্থানীয়দের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া। ঘূর্ণিঝড় - পরবর্তী সময়ে দ্রুত চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল টিম দুর্গম এলাকাগুলোতে ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করে।
জ। ফেনী, কুমিল্লা ও নোয়াখালীর ভয়াবহ বন্যা (২০২৪): ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে দেশের দক্ষিণ- পূর্বাঞ্চলে আকস্মিক ও প্রলয়ংকরী বন্যায় সেনাবাহিনী অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। হেলিকপটার এবং স্পিডবোট ব্যবহার করে ছাদ বা গাছের ওপর আটকে পড়া হাজার হাজার মানুষকে উদ্ধার করা বন্যা পরবর্তী সময়ে ভেঙে যাওয়া রাস্তা ও ব্রিজ দ্রুত মেরামতের মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখতে তাদের ইঞ্জিনিয়ারিং কোর বিশেষ ভূমিকা রাখে।
ঝ। ঘূর্ণিঝড় রিমাল (মে ২০২৪): ঘূর্ণিঝড় রিমাল মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর কার্যক্রম ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত। উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলে স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে সেনাবাহিনী দ্রুত বালুর বস্তা দিয়ে তা রক্ষা করার চেষ্টা করে। ক্ষতিগ্রস্ত খুলনা, সাতক্ষীরা ও পটুয়াখালীর দুর্গম চরাঞ্চলে শুকনো খাবার ও সুপেয় পানি পৌঁছে দেয় সেনাবাহিনী।
ঞ। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষা (৫ আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী): ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেশে যখন পুলিশি ব্যবস্থা সাময়িকভাবে ভেঙে পড়েছিল, তখন সেনাবাহিনী দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে। কারাগার, বিমানবন্দর এবং জাতীয় সম্পদ রক্ষায় সেনাবাহিনী দিনরাত টহল দেয়। সারা দেশে যৌথ অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অপরাধীদের দমনে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখছে। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সাভার ও গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা নিরসনে সেনাবাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানেও দেশে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্বৃত্ত দমনে সেনাবাহিনী ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার'-এর আওতায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে।
ট। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও নিরাপত্তা: ২০২২- ২০২৪ সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠী (যেমন: কেএনএফ বা কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট) এর তৎপরতা বৃদ্ধি পেলে সেনাবাহিনী অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে তাদের দমন এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিযান পরিচালনা করছে। এতে অনেক সেনাসদস্য প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় কাজ করছেন। বান্দরবানের রুমা ও থানচিতে ব্যাংক ডাকাতির পর অপহৃত ব্যাংক কর্মকর্তাকে উদ্ধার এবং সন্ত্রাসীদের দমনে তারা সফল অপারেশন চালায়। অভিযানের পাশাপাশি পাহাড়ের সাধারণ মানুষের জন্য বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে।
৬। সেনাবাহিনীর সক্ষমতা ও বিশেষায়িত প্রযুক্তি: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সেনাবাহিনীর সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাদের বিশেষায়িত ইউনিট ও প্রযুক্তির ব্যবহার:
ক। ইঞ্জিনিয়ারিং কোর: দ্রুত রাস্তা তৈরি, বাঁধ নির্মাণ এবং ধ্বংসস্তূপ সরানোর জন্য তাদের কাছে আছে ভারী যন্ত্রপাতি (Heavy Equipment), ক্রেন ও বুলডোজার।
খ। সিগন্যালস কোর: যখন মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ করে না, তখন সেনাবাহিনীর নিজস্ব হাই- ফ্রিকোয়েন্সি রেডিও নেটওয়ার্ক যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হয়ে ওঠে।
গ। ড্রোনের ব্যবহার: সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং নিখোঁজদের অবস্থান শনাক্ত করতে সেনাবাহিনী ড্রোনের ব্যবহার বাড়িয়েছে।
ঘ। উভচর যান ও স্পিডবোট: বন্যার সময় চলাচলের জন্য সেনাবাহিনীর কাছে থাকা আধুনিক উভচর যানগুলো অত্যন্ত কার্যকরী।
৭। চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা: এত সাফল্য সত্ত্বেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগের তীব্রতা ও সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, যার সঙ্গে তাল মেলাতে আরো আধুনিক সরঞ্জামের প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের অত্যধিক জনঘনত্বের কারণে উদ্ধারকাজে অনেক সময় বেগ পেতে হয়। তৃতীয়ত, আন্তঃবাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের অভাব মাঝে মাঝে উদ্ধারকাজে ধীরগতি আনতে পারে, যদিও 'স্ট্যান্ডিং অর্ডারস অন ডিজাস্টার' এই সমস্যা সমাধানে কাজ করছে। এছাড়া, পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধারকাজে প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত সরঞ্জামের ঘাটতি মাঝে মাঝে অনুভূত হয়।
৮। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সুপারিশ: আগামী দিনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সেনাবাহিনীকে আরো কার্যকর করতে হলে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
ক। প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন: আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) ব্যবহার করে দুর্যোগের পূর্বাভাস এবং ক্ষয়ক্ষতির মডেলিং করা। স্যাটেলাইট ইমেজের রিয়েল- টাইম অ্যাক্সেস নিশ্চিত করা।
খ। কমিউনিটি এনগেজমেন্ট: দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোতে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক বা 'কমিউনিটি রেসপন্স টিম' গড়ে তোলা, যারা সেনাবাহিনীর গাইডলাইন অনুযায়ী কাজ করবে।
গ। টেকসই অবকাঠামো: উপকূলীয় অঞ্চলে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সহায়তায় বহুমুখী সাইক্লোন শেল্টার ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া।
ঘ। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করার সুবাদে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুর্যোগ মোকাবিলার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। হাইতি বা আফ্রিকান দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেশের প্রেক্ষাপটে কাস্টমাইজ করে কাজে লাগানো যেতে পারে।
৯। উপসংহার: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এখন আর কেবল ত্রাণ বিতরণের বিষয় নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকার সক্ষমতার পরীক্ষা। বাংলাদেশ নামক বদ্বীপ রাষ্ট্রটির অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রকৃতির নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যে পেশাদারিত্ব, দক্ষতা এবং মানবিকতার পরিচয় দিয়ে আসছে, তা নিঃসন্দেহে গর্ব করার মতো। ভবিষ্যতের পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন ও বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে তাদের নিবিড় সমন্বয় অপরিহার্য। দুর্যোগ আসবে, কিন্তু প্রস্তুতি ও সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সেই দুর্যোগকে জয় করাই হবে বাংলাদেশের লক্ষ্য, যেখানে সেনাবাহিনী থাকবে আস্থার অবিচল স্তম্ভ হয়ে।
লেখক: সেনা কর্মকর্তা