রমজানের বিকাল। রাজধানীর কাওরান বাজারে ফলের দোকানগুলোর সামনে আলো-ছায়ার ভিড়। ঝুলছে লালচে আপেল, ঝকঝকে কমলা, স্বচ্ছ আঙুরের থোকা। কিন্তু হাত বাড়ালেই যেন দামে ধাক্কা। দরদাম করতে করতে আব্দুল আলিম নামে এক ক্রেতা হাল ছেড়ে বললেন, ‘ইফতারি তো দূরের কথা, বিদেশি ফলের স্বাদই নেওয়া যাবে না এবার।’ একটু পরই তিনি আপেল-কমলার দোকান ছেড়ে পাশের পেয়ারা-বরইয়ের ঝুড়ির দিকে হাঁটলেন। কাছে গিয়ে কথা বলতেই ক্ষোভ প্রকাশ করে জানালেন, প্রতি কেজি মাল্টা ৩৩০ টাকা দরে কিনতে হয়েছে তাকে। অথচ রমজানের আগেও এ মাল্টার দাম ছিল ২৩০-২৫০ টাকার আশপাশে। রমজানের শুরুতেই বাজারে ফলের দাম এমনভাবে চড়া হয়ে উঠেছে যে নিম্নবিত্তের কাছে তা কার্যত নাগালের বাইরে চলে গেছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও বর্তমান দামে প্রয়োজনীয় ফল কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। ইফতারের জন্য ন্যূনতম কয়েকটি ফল তুলতেই আগের তুলনায় অনেক বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বৃহত্তম পাইকারি ও খুচরা বাজার কাওরান বাজার সরেজমিনে দেখা গেছে, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিটি ফলের দাম কেজিতে বা ডজনে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ইফতারের অন্যতম অনুষঙ্গ কলার দাম বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। গত সপ্তাহে ১০০-১২০ টাকা ডজন দরে বিক্রি হওয়া সবরি কলা এখন ১৬০ টাকা। সাগর কলা ৮০ থেকে বেড়ে ১২০ টাকা এবং কবরি কলা ১০০-১২০ টাকা ডজনে বিক্রি হচ্ছে। বিদেশি ফলের বাজার আরো চড়া। ভালো মানের প্রতি কেজি আপেল ৩৫০-৪০০ টাকা কেজি, যা আগে ছিল ৩০০ টাকার মধ্যে। সবুজ আঙুর ৪২০-৪৫০ টাকা এবং কালো আঙুর বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ টাকা কেজি দরে। থাইল্যান্ডের কাঠিমন আমের দাম ৪০০ টাকা, নাশপাতি ৪২০। মাল্টা এখন ৩৩০ টাকা কেজি, যা গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছে ২৫০ টাকার কম দামে। মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এক কেজি আঙুর বা আপেল কেনা এখন রীতিমতো বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মৌসুমি ও দেশি ফলের দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। বাজারে নতুন আসা তরমুজ পিস হিসেবে নয়; বরং ১০০-১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া পেঁপে ১৭০-১৮০ টাকা, পেয়ারা ১৩০ টাকা। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাগালে থাকা দেশি কুল বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা কেজি দরে। এছাড়া বিদেশি ফল আনার বা বেদানা ৫২০-৫৬০ টাকা এবং রসালো স্ট্রবেরি ৬০০-৭০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
সবচেয়ে বড় বিপত্তি দেখা দিয়েছে ইফতারের আরেক প্রধান অনুষঙ্গ খেজুরে। মানভেদে খেজুর ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি আজওয়া বিক্রি হচ্ছে ৯০০-১০০০ টাকায় এবং প্রিমিয়াম কোয়ালিটির খেজুর ১৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া প্রতি কেজি পাকা পেঁপে ১৭০-১৮০ টাকা এবং পেয়ারা ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি ফলের মধ্যে ছোট আকারের বরই ৭০ টাকা হলেও উন্নত মানের কুল বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা কেজি দরে। একটি ছোট আকারের আনারসের দাম প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা। প্রতিটি বেলের দাম ১২০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। সফেদা ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
সাজিদ আহমেদ নামে এক জন ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রমজানের অজুহাতে হঠাত্ মূল্যবৃদ্ধির কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। পরিবারের সবাই রোজা রাখছেন বলেই বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। বাজারে প্রচুর সরবরাহ থাকলেও বিভিন্ন অজুহাতে বিক্রেতারা এ চড়া দাম আদায় করছেন। বাজারে কেনাকাটা করতে আসা এক বেসরকারি চাকরিজীবী হাতে এক ফানা সবরি কলা নিয়ে দাঁড়িয়ে। কাছে গিয়ে দাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কঠিন দাম। যে কলা গত সপ্তাহে ১০০ টাকায় কিনেছি, তা এখন ১৬০ টাকা। পরিবারের সবার রোজা ও ইফতারে একটু ফল না হলে চলে না, তাই বাধ্য হয়ে বেশি দামেই কিনতে হলো।’
শাহিন আলম নামে এক ক্রেতা বলেন, রোজায় সব প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়া যেন এক অনিবার্য রেওয়াজ। এবারও সে একই প্রবণতা দেখা গেছে। ব্যতিক্রম হয়নি। এগুলো মনিটরিংয়ে সরকারের গুরুত্ব দিতে হবে। মাইনুল ইসলাম নামে আরেক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, ‘সবকিছুর দাম হু হু করে বাড়ছে, কেবল দাম কমছে মানুষের। দামে কুলাইতে পারি না, আবার ইফতারে পরিবারের জন্য ভালো খাবার তুলে দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাজারে কোনো তদারকি নেই বলেই এত বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।’ অধিকাংশ ক্রেতারই অভিযোগ বাজার মনিটরিং না থাকায় রমজানকে পুঁজি করে বিক্রেতারা মানুষের পকেট কাটছে। এটা এক ধরনের জুলুম।
ফলের মূল্যবৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে খুচরা বিক্রেতারা দুষছেন পাইকারি বাজার বা আড়তদারদের। ফজল আমিন মানিক নামে এক জন কলা বিক্রেতা জানান, ‘রোজার মাস শুরু হতেই কলার আড়তে প্রতি পৌন (২০ হালি) কলা আমাদের ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। বেশি দামে কিনলে তো কম দামে বেচতে পারি না।’ অন্য বিক্রেতারা বলছেন, রমজানে ফলের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়, কিন্তু সেই তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম কিছুটা বাড়তি। আড়ত থেকে দাম না কমলে খুচরা বাজারে দাম কমার সম্ভাবনা নেই।