শিল্পে ব্যবহূত লবণ উঠছে খাবার পাতে!

ইন্ডাস্ট্রিয়াল লবণ বা গ্লোবাল সল্ট ব্যবহূত হয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ওয়াশিং পাউডার হিসেবে। এটি আমদানি করা হয় শিল্প লবণ হিসেবে। অভিযোগ উঠেছে, শিল্প খাতের ধবধবে সাদা এই দানাদার লবণে আয়োডিন মিশিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে। শুধু ছোটোখাটো লবণ মিল কিংবা আড়তদারই নয়, বড়ো বড়ো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের লোকজনও এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে বলে জানা গেছে।

কারণ লবণের চালান বাজারজাত করতে পারলেই রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এক কেজি শিল্প লবণ বিক্রি করে ঐ অসাধু চক্র প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা লাভ করছে।

লবণ নামধারী শিল্প লবণ তথা সোডিয়াম সালফেট খেতে থাকলে কিডনি ও লিভার নষ্ট হয়। এছাড়া ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে বন্দর উপজেলার আলীনগর এলাকায় অ্যারাবিয়ান সল্ট নামের কারখানার গুদামঘর থেকে সাড়ে ৩৭ টন ইন্ডাস্ট্রিয়াল লবণ জব্দ এবং কারখানার মালিক কামরুল ইসলামকে পুলিশ গ্রেফতার করলেও এখনো নারায়ণগঞ্জের এক ডজনের বেশি গোডাউনে চলছে ভেজাল লবণের কারবার।

জানা যায়, শিল্প লবণ লন্ড্রিতে ডিটারজেন্ট, গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিতে ফাইনিং এজেন্ট (বাতাস দূর করার উপকরণ), কার্পেট ফ্রেশনার (ময়লা পরিষ্কারক) হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া ডায়িং ও স্পিনিং কারখানা, পেপার মিল, জুট মিল, চামড়া পরিশোধন, জুতার চামড়া পরিশোধন কারখানায় ব্যবহূত হয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিল্প লবণ মানুষের শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি করে। আমরা যে লবণ (সোডিয়াম ক্লোরাইড) খাই, তা সহজে হজম হয়। কিন্তু শিল্প লবণ সহজে হজম হয় না; বরং পানি শোষণ করে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. নুরুল আমিন গণমাধ্যমকে বলেন, সোডিয়াম ক্লোরাইডের (খাওয়ার লবণ) সঙ্গে সোডিয়াম সালফেট মিশ্রিত হলে তা খাওয়া যাবে না। এই মিশ্রণটি মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর।

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সেলিম রেজা বলেন, ‘আমি রসায়নের ছাত্র ছিলাম। খাওয়ার লবণের একটি ভৌত পরীক্ষা হলো, এটি খোলা অবস্থায় রেখে দিলে তা জলীয়বাষ্প শোষণের মাধ্যমে ভিজে যায়। কিন্তু সেটা যদি না হয়, তাহলে বুঝতে হবে যে ঐ লবণে ভেজাল রয়েছে।

এদিকে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসে সোডিয়াম সালফেট আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার টন। অধিকাংশ চালান এসেছে চীন থেকে। কিছু কিছু থাইল্যান্ড, ইরানসহ কয়েকটি দেশ থেকে এসেছে। এই হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে সোডিয়াম সালফেট আসছে প্রায় ৫০ হাজার টন।

বন্দর উপজেলার আলীনগর এলাকায় একটি লবণের গুদামঘর থেকে ৫০ কেজি ওজনের ৭৫০ বস্তা ইন্ডাস্ট্রিয়াল লবণ জব্দ করেছে পুলিশ। ঐ সময়ে গোডাউন ও কারখানার মালিক কামরুল ইসলামকে (৪২) গ্রেফতার করা হয়েছে। এদিকে বিসিকের হিসাব অনুযায়ী, আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা, অর্থাত্ কোরবানির  ঈদে লবণ প্রয়োজন ১৭ লাখ মেট্রিক টন। অথচ দেশেই সনাতন পদ্ধতিতে লবণ উত্পাদন হয়েছে ২১ লাখ মেট্রিক টন। কিন্তু একটি চক্র নিজেদের পকেট ভারী করতে  শিল্প লবণকে দেশীয় লবণ হিসেবে বাজারজাত করছে।