চয়ন

নানা কথা

 

সেদিন আমাকে একজন বন্ধু জিজ্ঞাসা করছিলেন, নূতন কবির আর প্রয়োজন কী। পুরাতন কবির কবিতা তো বিস্তর আছে। নূতন কথা এমনই কী বলা হচ্ছে। পুরাতন নিয়েই তো কাজ চলে যায়।

নূতনই পুরাতনকে রক্ষা করে থাকে। পুরাতনের মধ্যেই নূতনের বাস। নূতন-পুরাতনে বিচ্ছেদ হলেই জীবনের অবসান। যেদিন দেখব পৃথিবীতে নূতন কবি আর উঠছে না সেদিন জানব, পুরাতন কবিদের সম্পূর্ণ মৃত্যু হয়েছে।

নূতন কবিতার ধারা শুষ্ক হলে পুরাতনে পৌঁছবার স্রোত বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের মধ্যেকার এ দীর্ঘ ব্যবধান অবিশ্রাম লোপ করে রাখছে কে। নূতন কবিতা।

প্রত্যেক বসন্ত পুরাতনকেই পায় নূতন গানে নূতন ফুলে। আমরা বলি নবীন বসন্ত, কিন্তু প্রত্যেক বসন্তই পুরাতন বসন্ত।

 

ব্যাপ্ত হলে যা অন্ধকার, সংহত হলে তা আলোক; আরো সংহত হলে তা অগ্নি। সংহতিই প্রাণ। সংহত হলেই তেজ, প্রাণ, আকার, ব্যক্তি জাগ্রত হয়ে ওঠে। আমরা জড়োপাসক, শক্তি-উপাসক বলেই বৃহত্ত্বের উপাসনা করে থাকি, বৃহত্ত্বে অভিভূত হয়ে যাই। কিন্তু বৃহত্ অপেক্ষা ক্ষুদ্র অধিক আশ্চর্য। হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন বাষ্পরাশি অপেক্ষা একবিন্দু জল আশ্চর্য। সুবিস্তৃত নীহারিকা অপেক্ষা সংক্ষিপ্ত সৌরজগত্ আশ্চর্য। আরম্ভ বৃহত্, পরিণাম ক্ষুদ্র। আবর্তের মুখ অতি বৃহত্, আবর্তের শেষ বিন্দুমাত্র। সুবিশাল জগত্ ঘুরে ঘুরে এই ক্ষুদ্রত্বের দিকে, বিন্দুত্বের দিকে চলে। কেন্দ্রের মহত্ আকর্ষণে পরিধি সংক্ষিপ্ত হয়ে কেন্দ্রত্বে আত্মবিসর্জন করতে যায়।

যত বৃহত্ হই তত দেশকালের অধীন হতে হয়। আয়তন নিয়ে আমাদের নিরন্তর যুদ্ধ। কার সঙ্গে? দানব কাল ও দানব দেশের সঙ্গে। দেশকাল বলে, ‘আয়তন আমার। আমার জিনিস আমাকে ফিরিয়ে দাও।’ অবিশ্রাম লড়াই করে অবশেষে কেড়ে নেয়। শ্মশানক্ষেত্রে তার ডিক্রিজারি।

কিন্তু আমরা জানি, আমরা মৃত্যুকে জিতব। অর্থাত্ দেশকালকে অতিক্রম করব। মনুষ্যের অভ্যন্তরে এক সেনাপতি আছে। সে যুদ্ধ করছে। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মরছে, কিন্তু যুদ্ধের বিরাম নেই। আমরা সংহতিকে অধিকার করে ব্যাপ্তিকে জিতব। মনুষ্যত্বের এই সাধনা।        (অংশবিশেষ)

সূত্র: বিচিত্র প্রবন্ধ/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়)