ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে-মর্নিং শোজ দ্য ডে। যদিও সকাল পরিষ্কার থাকিলেও দুপুরে ঝমঝমাইয়া বৃষ্টি হইতে পারে, বিকালে হইতে পারে কালবৈশাখী। তাহার পরও বিজ্ঞজনেরা আশা করেন, দিনের শুরুটা বহু ক্ষেত্রেই সারা দিনের আভাস প্রদান করে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমান যেই সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছেন-তাহা সেই প্রভাতের কয়েকটি ইঙ্গিত প্রকাশ করিতেছে।
প্রথমেই আমরা দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে পারি কয়েকটি প্রতীকী কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তের দিকে। ঢাকা এবং সারা দেশে বিভিন্ন সড়কে তাকে অভিনন্দন জানাইয়া স্থাপন করা ব্যানার, বিলবোর্ড ও তাহার ছবিসংবলিত বিজ্ঞাপন দ্রুত অপসারণের নির্দেশ প্রদান করেন তিনি। গুলশান হইতে সচিবালয়ে যাইবার পথে হাতিরঝিল এলাকায় নিজের ছবিসংবলিত একটি ব্যানার দেখিয়া তিনি তৎক্ষণাৎ তাহা সরাইবার নির্দেশ দেন। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তিপূজার প্রবণতা বহু দিন ধরিয়াই বিদ্যমান।
এই প্রেক্ষাপটে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিছক প্রশাসনিক নির্দেশ নহে-ইহা পরিণত রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক ভিন্ন বার্তাও বহন করে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়িতা প্রসঙ্গে তাহার উদ্যোগ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সচিবালয়ে নিজের কার্যালয়ে প্রবেশ করিয়া তিনি অপ্রয়োজনীয় লাইট বন্ধ করিয়া দেন এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রকের তাপমাত্রা ২৫.১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নির্ধারণ করেন। ইহার পাশাপাশি সরকারি দপ্তরসমূহে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযম অবলম্বনের আহ্বান জানান এবং দিনের বেলা কৃত্রিম আলোর পরিবর্তে সূর্যের আলো ব্যবহারের কথা বলেন।
রাষ্ট্রপরিচালনায় অনেক সময় ছোট ছোট আচরণই বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক হইয়া উঠে-এই পদক্ষেপগুলি তেমনই কিছু দৃষ্টান্ত। আরো একটি বিষয় জনমনে আলোচনার জন্ম দিয়াছে-ভিআইপি প্রটোকল কমাইবার সিদ্ধান্ত। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি রাস্তায় চলাচলের সময় অতিরিক্ত প্রটোকল পরিহার করিয়া ট্রাফিক সিগন্যাল মানিয়া চলিবার নির্দেশ দেন। রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে দীর্ঘদিন ধরিয়াই ভিআইপি চলাচল সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের ভোগান্তির কারণ ছিল। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হইয়াছে, এই পরিবর্তনের ফলে যানবাহনের গড় গতিবেগও কিছুটা বৃদ্ধি পাইয়াছে।
প্রশাসনের অভ্যন্তরেও তাহার কিছু মানবিক আচরণের কথা শুনা গিয়াছে। সচিবালয়ের বহু দিনের কর্মচারীদের সহিত তিনি ব্যক্তিগতভাবে কথা বলিয়াছেন এবং তাহাদের পরিবারের খোঁজখবর লইয়াছেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের বিশাল কাঠামোর ভিতরে যাহারা নীরবে দায়িত্ব পালন করিয়া যান, তাহাদের সহিত এই সরাসরি যোগাযোগ প্রশাসনিক পরিবেশে একধরনের নূতন আবহ সৃষ্টি করে। এইদিকে বাজার পরিস্থিতির প্রতিও তাহার দৃষ্টি পড়িয়াছে। মোটা চাউলের মূল্য বৃদ্ধির সংবাদ পাওয়ার পর তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন। সাধারণ মানুষের জীবনের সহিত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য সরাসরি সম্পর্কিত-অতএব এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ জনদৃষ্টি আকর্ষণ করাই স্বাভাবিক। উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা প্রসঙ্গেও তিনি উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছেন। জলদস্যুতা, ডাকাতি ও চোরাচালান প্রতিরোধ এবং জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করিবার লক্ষ্যে কোস্ট গার্ডকে টহল জোরদার করিবার নির্দেশ প্রদান করা হইয়াছে। বাংলাদেশের দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং সেইখানে বসবাসকারী বিপুল মানুষের জীবিকার সহিত এই নিরাপত্তা প্রশ্নটি নিবিড়ভাবে জড়িত।
এই সমস্ত পদক্ষেপের দিকে তাকাইলে একটি বিষয় স্পষ্ট হইয়া উঠে-দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম প্রহরেই তিনি কিছু প্রতীকী ও প্রশাসনিক বার্তা দিতে সচেষ্ট হইয়াছেন। রাজনৈতিক জীবনে তাহার পথপরিক্রমা নিঃসন্দেহে সহজ ছিল না-সেইখানে ছিল অভিযোগ, বিতর্ক, দীর্ঘ নির্বাসন এবং পুনরাগমনের নানা অধ্যায়। তাহার পরও সময়ের সহিত মানুষ ও রাজনীতি উভয়ই পরিবর্তিত হয়-এই বিশ্বাস মানবসভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাহার নিজের ভাষাতেও স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সময় উচ্চারিত হইয়াছে-দেশের মানুষের জন্য একটি পরিকল্পনার কথা।
ইতিহাসের বিচার অবশ্যই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে সম্পন্ন হয়। কোনো নেতার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় তাহার কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায়; কিন্তু যাত্রার শুরুটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রভাতের আলো যেমন দিনের সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করে, তেমনি 'স্টেটসম্যান' হইবার এই সকল পদক্ষেপও ভবিষ্যতের একটি স্পষ্ট আভাস প্রদান করে বলিয়াই আমরা বিশ্বাস করি। সেই কারণে প্রভাতের এই আভাসগুলি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বলিয়াই প্রতীয়মান হইতেছে। ইহা দেশ ও জনগণের কল্যাণ বহিয়া আনিবারই ইঙ্গিত দেয়।