যুদ্ধের আতশবাজিতে অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবী

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৬, ০৬:০০

বিশ্ব অর্থনীতি আবারও অনিশ্চয়তার ঘূর্ণাবর্তে প্রবেশ করিতেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমাইয়া ৩ শতাংশে নামাইয়া আনিয়াছে। কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, বাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান বিভাজন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির বহুমাত্রিক ঝুঁকি। যুদ্ধের অভিঘাত কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না-তাহার ঢেউ পৌছায় পৃথিবীর প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত। বাংলাদেশও এই অভিঘাত হইতে মুক্ত নহে। যেই কৃষক কখনো তেহরান বা তেল আবিবের নামও শুনেন নাই, তিনিও একদিন বাজারে গিয়া বুঝিতে পারেন, যুদ্ধের মূল্য তাহাকেও পরিশোধ করিতে হইতেছে। এমনিতেই দেশের সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ক্ষীয়মাণ। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য এখনো মানুষের নাগালের বাহিরে। অধিকাংশ পরিবার ব্যয়ের খাতা কাটিয়া কাটিয়া দিন পার করিতেছে। বহু মানুষের হাতে উদ্বৃত্ত অর্থ নাই, অনেকের হাতেই প্রয়োজনীয় অর্থও নাই। নিম্নবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তও আজ নীরব সংকটে নিমজ্জিত। ভবিষ্যৎ লইয়া তাহাদের উদ্বেগ দিনদিন বৃদ্ধি পাইতেছে।

রাষ্ট্রের অবস্থাও খুব স্বস্তিদায়ক নহে। রাজস্ব আহরণ, উন্নয়ন ব্যয়, ঋণ পরিশোধ-সর্বত্রই চাপ। সরকার অর্থসংকট মোকাবিলার চেষ্টা করিতেছে; কিন্তু সংকুচিত সম্পদের মধ্যে একদিকে উন্নয়ন, অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তা, পুনরায় বৈদেশিক দায় পরিশোধ-সকল কিছুর ভার বহন করা সহজ নহে। বিশ্ব অর্থনীতির সামান্য ঝাঁকুনিও বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। অথচ এই সংকটের মূল উৎস কোথায়? তাহার উত্তর যুদ্ধ। একদিকে ক্ষেপণাস্ত্র, অন্যদিকে পালটা ক্ষেপণাস্ত্র। একদিকে ড্রোন, অন্যদিকে বোমারু বিমান। পৃথিবীর প্রভাবশালী শক্তিগুলি যেন যুদ্ধের নামে এক ভয়াবহ আতশবাজির উৎসবে মত্ত। আকাশ আলোকিত হইতেছে বিস্ফোরণের ঝলকে; কিন্তু সেই আলো মানুষের ঘরে পৌঁছায় না। তাহার ধোঁয়ায় ঢাকিয়া যায় ভবিষ্যতের সূর্য। এই আতশবাজির প্রতিটি ফুলকি জ্বালানি তৈলের মূল্য বৃদ্ধি করে, খাদ্যপণ্যের বাজার অস্থির করে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ায় এবং কোটি কোটি নিরীহ মানুষের জীবনে নতুন দুর্ভোগের জন্ম দেয়।

দুঃখজনক হইল, বিশ্বরাজনীতির এই বৃহৎ খেলায় সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট যেন পরিসংখ্যানের একটি সংখ্যা মাত্র। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ক্ষমতাবানরা; কিন্তু তাহার মূল্য দেয় শিশুরা, শ্রমিকেরা, কৃষকেরা, নিম্নবিত্ত পরিবারগুলি এবং উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ জনগণ। মানবিক বিপর্যয়ের সংবাদ কিছুদিন সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়, পরে তাহাও হারাইয়া যায় নূতন কোনো সংঘাতের সংবাদে; কিন্তু যেই পরিবার একবেলা আহার কমাইয়া দেয়, যেই শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছাড়িয়া জীবিকার সন্ধানে নামে, যেই রোগী ঔষধ কিনিতে পারে না-তাহাদের কাহিনি ইতিহাসের পাতায় স্থান পায় না। বিশ্বের পরাশক্তিগণ যদি সত্যই মানবতার নেতৃত্বের দাবিদার হন, তাহা হইলে তাহাদের প্রথম দায়িত্ব যুদ্ধের বিস্তার নহে, শান্তির প্রতিষ্ঠা। অস্ত্রের প্রতিযোগিতা, নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি এবং আধিপত্য বিস্তারের কূটনীতি বিশ্ব অর্থনীতিকে যতটা ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহার বহু গুণ অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষের জীবন। উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্যনিরাপত্তা ও জলবায়ু সংকটের মতো মৌলিক প্রশ্নগুলি যুদ্ধের ধোঁয়ার আড়ালে চাপা পড়িয়া যাইতেছে।

বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতা একটি কঠিন সতর্কবার্তা। অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা, উৎপাদন বৃদ্ধি, অপচয় রোধ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। ইহার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তির পক্ষে আরো উচ্চকণ্ঠ হওয়াও জরুরি। কারণ যুদ্ধ কোনো দেশের একার ক্ষতি করে না-যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত সমগ্র মানবসভ্যতার বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি ব্যয়বহুল আত্মঘাতী আয়োজন।

আজ নূতন কোনো 'যুদ্ধজয়' নহে, বিশ্বের প্রয়োজন 'মানুষের জয়'। সুতরাং পৃথিবীর আকাশে আর যুদ্ধের আতশবাজি নহে, প্রকাশিত হউক শান্তির বারতা। ক্ষেপণাস্ত্রের আলো কখনোই মানুষের ভবিষ্যৎ আলোকিত করে না-তাহা কেবল অন্ধকারকেই দীর্ঘতর করে।

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন