ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মাঝারদিয়া বাজারের এক কোণে পুকুরপাড়ে পড়ে আছে একটি ছোট্ট কাঠের পিঁড়ি। দেখতে খুব সাধারণ হলেও এই পিঁড়ির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে এক মানুষের ৬৬ বছরের জীবনের গল্প। সেই পিঁড়িতেই বসে মানুষের চুল-দাড়ি কাটেন ৮৭ বছর বয়সী অকিল শীল।
সোমবার (৯ মার্চ) বিকালে সরেজমিনে দেখা যায়, পুকুরপাড়ের ছোট জায়গাটিতে বসে মনোযোগ দিয়ে একজনের চুল কাটছেন তিনি। সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন কয়েকজন গ্রাহক। কেউ আবার ধৈর্য ধরে সিরিয়ালে বসে আছেন। যেন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখনও টিকে আছে এক পুরোনো বিশ্বাস।
সময় বদলেছে, বাজারে আধুনিক সেলুন হয়েছে, ঝকঝকে চেয়ার আর বড় বড় আয়না বসেছে। কিন্তু বদলায়নি অকিল শীলের কর্মস্থল, বদলায়নি তার জীবনযুদ্ধের পথ। আজও হাটের দিনে তিনি পুকুরপাড়ে এসে সেই পুরোনো পিঁড়িতে বসেন, হাতে থাকে বহু বছরের সঙ্গী কাঁচি আর ক্ষুর।
অকিল শীলের বাড়ি নগরকান্দা উপজেলার সদর গ্রামের চৌমুখা এলাকায়। পিতা হরিবদন শীলের হাত ধরেই ছোটবেলায় নাপিতের পেশায় নামেন তিনি। তখন ছিল না কোনো সেলুন, ছিল না আধুনিকতার ছোঁয়া। মানুষের চুল কাটতে হতো বাজারের খোলা জায়গায়, পুকুরপাড়ে বা গাছতলায় বসে। সেই সময় থেকেই শুরু তার পথচলা, যা আজও থামেনি।
সপ্তাহে দুই দিন মাঝারদিয়া বাজারে হাট বসে। হাটের দিন সকাল হলেই ধীর পায়ে বাজারে আসেন অকিল শীল। পুকুরপাড়ে একটি ছোট কাঠের পিঁড়ি পেতে বসেন। তারপর শুরু হয় তার বহু বছরের চেনা কাজ চুল-দাড়ি কাটা। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও তার কাজের আগ্রহ একটুও কমেনি।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী মাতুব্বর বলেন, আমি সেলুনে চুল কাটাই না। ছোটবেলা থেকেই অকিল শীলের কাছেই চুল কাটাই। তার হাতে চুল কাটালে আলাদা একটা ভালো লাগা কাজ করে।
স্থানীয় সাইদুল বলেন, ধনী-গরিব সবার সঙ্গেই তার ব্যবহার একই রকম। অকিল শীলের কাছে চুল কাটাতে একটা আলাদা আনন্দ আছে, যেন পুরোনো দিনের গন্ধ পাওয়া যায়।
অকিল শীল বলেন, বর্তমানে তিনি প্রতি জনের চুল কাটার জন্য ৫০ টাকা নেন। হাটের দিনে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন গ্রাহক তার কাছে আসেন। সেই সামান্য আয় দিয়েই কোনোভাবে সংসার চালানোর চেষ্টা করেন।
তিনি আরও বলেন, ছোটবেলা থেকেই এই কাজ করছি। তখন বাজারে কোনো সেলুন ছিল না। পুকুরপাড়ে বসেই মানুষের চুল কেটে সংসার চালিয়েছি। এখন বয়স হয়েছে, তবু কাজ না করলে মন ভালো লাগে না।
অকিল শীলের পাঁচ ছেলে-মেয়ে তবে তাদের কেউই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত নন। তবু নিজের ভালোবাসার কাজটি এখনও ছাড়তে পারেননি তিনি।
হাটের দিনে আজও পুকুরপাড়ে বসে থাকেন তিনি হাতে কাঁচি আর ক্ষুর। আর কাঁচির টুংটাং শব্দে যেন ধীরে ধীরে লেখা হয়ে চলে তার ৬৬ বছরের শ্রম, স্মৃতি আর সংগ্রামের গল্প।