দুই মাসের কোলাহল শেষে আবার নীরব সেন্টমার্টিন

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:১৩

নীল সমুদ্র, স্বচ্ছ জলরাশি, প্রবালের রঙিন জগৎ আর নির্জন সৈকতের অপার শান্তি- এই সবকিছুকে ঘিরে গত দুই মাস প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠেছিল দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি- শীতের এই সময়টুকু ছিল পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত। তবে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ায় গত রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) থেকে দ্বীপে পর্যটকদের ভ্রমণ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আবার ধীরে ধীরে ফিরে আসছে দ্বীপের স্বাভাবিক নীরবতা।

চলতি মৌসুমে দেশি-বিদেশি হাজারো পর্যটক পরিবার-পরিজন নিয়ে সেন্টমার্টিনে ভ্রমণে আসেন। কেউ প্রকৃতির টানে, কেউবা ব্যস্ত শহুরে জীবন থেকে সাময়িক মুক্তির আশায় ছুটে আসেন এই ছোট্ট দ্বীপে। নীল সমুদ্রের ঢেউ, দিগন্তজোড়া জলরাশি, স্বচ্ছ পানিতে দৃশ্যমান প্রবাল ও সামুদ্রিক প্রাণ- সব মিলিয়ে সেন্টমার্টিন যেন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক স্বপ্নরাজ্য।

ঢাকা থেকে আসা পর্যটক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘সেন্টমার্টিনের পরিবেশ এক কথায় অসাধারণ। নীল সমুদ্র আর শান্ত পরিবেশ মনকে অন্যরকম প্রশান্তি দেয়। পরিবার নিয়ে সময় কাটাতে পেরে আমরা সত্যিই আনন্দিত।’

চট্টগ্রাম থেকে ভ্রমণে আসা শিরিন আক্তার বলেন, ‘প্রকৃতির এত কাছাকাছি থাকার সুযোগ খুব কমই পাওয়া যায়। সমুদ্রের ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখা, ঢেউয়ের শব্দ শোনা; এই অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।’

কক্সবাজার হয়ে জাহাজে করে দ্বীপে পৌঁছানো পর্যটক তৌফিক রহমানের অভিজ্ঞতাও ছিল ভিন্নরকম। তিনি বলেন, ‘জাহাজে করে সেন্টমার্টিন যাওয়ার পথটাই এক রোমাঞ্চ। চারপাশে শুধু সমুদ্র আর আকাশ। নীল জলরাশির মাঝে ভেসে যাওয়ার অনুভূতিটাই আলাদা। দ্বীপে পৌঁছে আরও সুন্দর দৃশ্য চোখে পড়ে। অনেক ছবি আর ভিডিও করেছি স্মৃতি হিসেবে।’

পর্যটকরা জানান, সৈকতে বসে সূর্যাস্ত উপভোগ করা ছিল ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। ডুবে যাওয়া সূর্যের লাল আভা যখন সমুদ্রের জলে ছড়িয়ে পড়ে, তখন পুরো পরিবেশ হয়ে ওঠে মায়াবী। পাশাপাশি স্বচ্ছ পানিতে ছোট মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর বিচরণ দেখার অভিজ্ঞতাও ছিল আনন্দদায়ক। পরিবার নিয়ে সৈকতে হাঁটা, বালুর ওপর বসে গল্প করা, স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া এবং নান্দনিক ছবি তোলা- সব মিলিয়ে স্মরণীয় সময় কাটিয়েছেন তারা।

এই দুই মাস পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সক্রিয় ছিল প্রশাসন। টুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের পুলিশ সুপার (অতিরিক্ত ডিআইজি) মো. আপেল মাহমুদ জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তাই ছিল তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। দ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন। নিয়মিত টহল, জাহাজঘাট ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নজরদারি জোরদার ছিল। সম্ভাব্য যেকোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত ছিলেন।

তিনি বলেন, ‘পর্যটকরা যাতে নির্ভয়ে ঘুরতে পারেন, সে বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়েছি। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও আমাদের সঙ্গে সমন্বয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।’

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম জানান,‘পর্যটকদের আগমনে দ্বীপে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছিল। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও উপকৃত হয়েছেন। তবে পর্যটন কার্যক্রমের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।’

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম বলেন, ‘নির্ধারিত সময় অনুযায়ী দুই মাস পর্যটন কার্যক্রম চালু ছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণেও নজর দেওয়া হয়েছে। সেন্টমার্টিন একটি স্পর্শকাতর পরিবেশগত এলাকা। তাই পর্যটন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।’

এখন পর্যটকবিহীন দ্বীপ আবার শান্ত। নেই সেই কোলাহল, নেই ভিড়। কেবল সমুদ্রের ঢেউ, বাতাসের শব্দ আর প্রকৃতির নিজস্ব ছন্দ। তবে যারা এ মৌসুমে সেন্টমার্টিনে গিয়েছেন, তাদের স্মৃতিতে রয়ে যাবে প্রবালদ্বীপের নীল জলের গল্প, সূর্যাস্তের রঙিন আকাশ আর শান্তির কিছু মুহূর্ত।

পরবর্তী মৌসুমে আবারও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠবে সেন্টমার্টিন- এই অপেক্ষায় এখন দ্বীপ, আর স্মৃতির ভাঁজে রেখে ফেরা পর্যটকরা।

ইত্তেফাক/কেএইচ