আন্তর্জাতিক অস্ত্রনীতি ও সমরনীতিতে শেষ কথা বলিয়া কিছু নাই। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও উত্পাদনের চুক্তিটি হইয়াছিল এখন থেকে ৩১ বত্সর পূর্বে। ঠান্ডা সময়ের সেই চুক্তি অবশেষে হিমঘরেই ঢুকিয়া গেল। ১৯৮৭ সালে তত্কালীন দুই পরাশক্তির স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক আইএনএফ চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের স্বল্প ও মধ্যপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উত্পাদন নিষিদ্ধ করা হইয়াছিল। কিন্তু ট্রাম্প-জামানায় আসিয়া যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি হইতে বাহির হইয়া গেল। আর এই প্রক্রিয়া শুরু হইয়াছিল গত ফেব্রুয়ারি হইতে। তখনই পূর্বাভাস পাওয়া গিয়াছিল যে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে এই চুক্তি হইতে সম্পূর্ণ সরিয়া যাইবে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। এই বত্সর ২ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সহিত তাল মিলাইয়া আইএনএফ চুক্তি হইতে সরিয়া যাওয়ার ঘোষণা দেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এবং ঘোষণার পরপরই তিনি বলিয়াছেন, রাশিয়া এখন হইতে নূতন নূতন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করিবে। অর্থাত্ এখন হইতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলির সহিত রাশিয়ার অস্ত্র-প্রতিযোগিতা নবমাত্রা লাভ করিবে। কারণ, এই চুক্তি হইতে সরিয়া যাইবার পর রাশিয়ার জন্য মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে আর কোনো বাধা থাকিতেছে না।
বিংশ শতাব্দীতে দুইটি ভয়াবহ মহাযুদ্ধের বীভত্সতা দেখিয়াছি আমরা। অস্ত্রের ঝনঝনানি আর সমর দামামার দাপট হ্রাস করিতে বিশ্বব্যাপী অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রসমূহ আরো বেশি সংকুচিত করিবার কথা। কী করিয়া অস্ত্র বিস্তার রোধ করা যায়, সেই বিষয়টি সর্বাগ্রে গুরুত্বারোপ করিবার কথা। এই কারণে বিভিন্ন ধরনের চুক্তির রক্ষাকবচের মাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিত অস্ত্র বিস্তারের লাগাম টানিবার চেষ্টা আমরা দেখিতে পাইয়াছি। তাহারই একটি উদাহরণ হিসাবে ১৯৮৭ সালে ঠান্ডা যুদ্ধের সময় তত্কালীন দুই পরাশক্তি ক্ষেপণাস্ত্র বিস্তার রোধে ঐতিহাসিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। চুক্তিতে সই করেন দুই দেশের তত্কালীন দুই নেতা রোনাল্ড রিগ্যান ও মিখাইল গর্বাচেভ। চুক্তি অনুযায়ী, দুই দেশের কেহই স্থল হইতে পরিচালিত পাঁচ শত হইতে সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে আঘাত হানিতে পারে, এমন ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার, তৈরি ও পরীক্ষা না করিবার বিষয়ে একমত হয়। কেবল তাহাই নহে, চুক্তির পর দুই দেশ মিলাইয়া কমপক্ষে দুই হাজার ছয় শত মিসাইল নষ্ট করে। কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার দিকে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ তুলিয়া বলিয়াছে—রাশিয়া ৫০০ কিলোমিটারের বেশি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করিয়াছে। যদিও রাশিয়া বলিয়াছে, ঐগুলির কোনোটিই ৪৮০ কিলোমিটারের বেশি পাল্লার নহে।
তবে অনেকেই মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের আসল মাথাব্যথা রাশিয়া নহে, চীন। কারণ, সম্প্রতি চীন মাঝারি পাল্লার অনেকগুলি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করিয়াছে। চীনের এক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর মতে, আইএনএফ চুক্তি হইতে যুক্তরাষ্ট্র সরিয়া গেলে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এমন অস্ত্র তৈরির নূতন এক প্রতিযোগিতা তৈরি হইতে পারে। ইহাতে নূতন করিয়া ঠান্ডা যুদ্ধের বাতাবরণ ফিরিয়া আসিতে পারে। ইহা শান্তিকামী বিশ্বের জন্য নূতন উত্কণ্ঠা তৈরি করিবে।