ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি :ফিলিস্তিনিদের আরেকটি দুঃস্বপ্ন!

বোরহান উদ্দীন

পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকে আজ অবধি যতগুলো অমানবিক ও অনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, ফিলিস্তিনের বুকে ইহুদিবাদী  ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত তার মধ্যে অন্যতম। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিতাড়িত এই দুর্ধর্ষ ও অবাধ্য ইহুদি জাতিকে আরব বিশ্বের বুকে জায়গা করে দিয়েছিল কথিত মানবতার ধ্বজাধারী কিছু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ‘ভাগ করো, শাসন করো’ নীতির দ্বারা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের শাসন ব্যবস্থা সমুন্নত রাখতে ব্রিটেন  ‘বেলফোর’ ঘোষণার মাধ্যমে এই ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলকে প্রতিষ্ঠিত করে। বেলফোর ঘোষণার ৩১ বছর পর ১৯৪৮ সালে আমেরিকা ও ব্রিটেনের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় জবরদস্তিমূলকভাবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে আত্মপ্রকাশ করে ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল। ৫৩১টি ফিলিস্তিনি গ্রাম ও শহর উচ্ছেদ করে ইহুদিদের জন্য স্বতন্ত্র এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর থেকে দেশ দুটির প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ইসরাইল অব্যাহতভাবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড অধিগ্রহণ করে চলেছে। এই ধারাকে নয়া রূপ দিতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ জিইয়ে রাখতে বিশ্বনেতাদের আহ্বান উপেক্ষা  করে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার  রাজনৈতিক ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন। এর ফলে ফিলিস্তিন-ইসরাইলে নতুন সংকটের শুরু হয়। ফিলিস্তিনিদের দুঃস্বপ্নের এখানেই শেষ নয়! ফিলিস্তিন-ইসরাইল শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে ট্রাম্প জামাতা জেরাড কুশনার ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন দূত হিসেবে নিয়োজিত জেসন জিনব্লাটের পরিকল্পনার মাধ্যমে নতুন একটি চুক্তিতে  স্বাক্ষর করেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যা ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’ বা ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ (?) নামে অভিহিত করা হয়। সংক্ষিপ্ত আকারে এই ষড়যন্ত্রমূলক চুক্তির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো—আরব বিশ্বে ফিলিস্তিন নামে কোনো রাষ্ট্র থাকবে না।

চুক্তি অনুযায়ী ফিলিস্তিনের নাম হবে নিউ প্যালেস্টাইন। ইসরাইল, পিএলও এবং হামাসের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা হবে। এ চুক্তির মাধ্যমে জেরুজালেমকে পৃথক করা হবে না বরং ইসরাইল ও নিউ প্যালেস্টাইন উভয়েরই রাজধানী হিসেবে ব্যবহূত হবে। নিউ প্যালেস্টাইন নিজস্ব কোনো সেনাবাহিনী গঠন করতে পারবে না। তারা শুধু পুলিশ বাহিনীর জন্য হালকা অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে। ইসরাইল ও নিউ প্যালেস্টাইনের মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে বৈদেশিক আক্রমণ থেকে নিউ প্যালেস্টাইনকে রক্ষা করবে ইসরাইল। এই প্রতিরক্ষা খরচ অবশ্যই ফিলিস্তিনকেও বহন করতে হবে। চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর হামাস তার ব্যক্তিগত অস্ত্রসহ যাবতীয় অস্ত্র মিশরীয় কর্তৃপক্ষের কাছ জমা দেবে।

চুক্তির ধারাগুলো পর্যালোচনা করলে যে কোনো বিবেকবান ব্যক্তি মাত্রই বুঝতে পারবেন যে, এই চুক্তির মাধ্যমে ইহুদিরা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিলুপ্তি চাচ্ছে। এ চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো ফিলিস্তিনের সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ইহুদি রাষ্ট্র সম্প্রসারণ করা। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শতবর্ষব্যাপী অত্যাচারের বৈধতা পেয়ে যাবে ইসরাইল। ৭ মে ইসরাইলের জাতীয় দৈনিক ‘হাইয়ুম’ চুক্তিটির নথি ফাঁস করে দেয়। এতে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করার আগেই বিশ্ববাসী সেটা কীভাবে গ্রহণ করবে তা বুঝতে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর বেশ সুবিধা হয়েছে। অপরদিকে, সত্যিই যদি এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবুও সেটা খুব আশ্চর্যের বিষয় হবে না।  আমাদের এ কথা মনে রাখতে হবে যে,  চুক্তিটা কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ফিলিস্তিন সংকট সমাধানের জন্য নয়। চুক্তিটা অবশ্যই ফিলিস্তিন-ইসরাইল শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য। তাহলে ইসরাইল-গাজা যুদ্ধ হলে কেন আমেরিকা ফিলিস্তিনিদের হত্যা করবে? অপরদিকে,  ইসরাইল যদি এই চুক্তি না মানে তাহলে কেন তাদের ব্যাপারেও অনুরূপ ‘হত্যাকাণ্ডের’ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না? ইসরাইলের ক্ষেত্রে চুক্তিতে বলা হচ্ছে, ‘আর যদি ইসরাইল এতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানায়,  তাহলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে সব ধরনের আর্থিক সহায়তা বন্ধ করবে।’ এখানে আবারো একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে। আর তা হলো, ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রই তো এই চুক্তির স্বপ্নদ্রষ্টা এবং এই চুক্তির মাধ্যমে ইসরাইলের স্বার্থসংরক্ষণ করা হয়েছে। তাহলে চুক্তিতে ইসরাইলের ‘স্বাক্ষর না করা’ বা ‘শাস্তি’র বিধান রাখার উদ্দেশ্যটা কী? শান্তিচুক্তির নামে এ প্রহসনপত্রে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ‘যদি হামাস ও পিএলও শতাব্দীর সেরাচুক্তিতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনের জন্য সব ধরনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বন্ধ করে দেবে এবং কোনো দেশ ফিলিস্তিনে অর্থ দিতে পারবে না।’ এই কি তাহলে শতাব্দীর সেরা শান্তি চুক্তি? হতভাগা ফিলিস্তিনিদের আবারো বুঝি নতুন দুঃস্বপ্নের শুরু হলো!

n লেখক :রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ (তৃতীয় বর্ষ)

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।