উত্তরবঙ্গের ঈদ যাত্রা: স্বস্তি ও শঙ্কার দোলাচল

আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে নাড়ির টানে ঘরমুখী মানুষের যাত্রা শুরু হইয়াছে। আত্মীয়স্বজনের সহিত ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করিয়া লইতে পরিবার-পরিজনসহ মানুষ বাস-ট্রেন ও লঞ্চসহ নানা যানবাহনে করিয়া রাজধানী ঢাকা ছাড়িতেছে। অতীত অভিজ্ঞতা হইতে দেখা যায়, প্রতি বৎসরই উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার খ্যাত ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক লইয়া যাত্রী ও চালকদের মনে একপ্রকার উৎকণ্ঠা বিরাজ করে। তবে ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এইবার উত্তরবঙ্গের মানুষের ঈদ যাত্রার সার্বিক চিত্রটি কিছুটা বৈচিত্র্যময়। একদিকে সিরাজগঞ্জ অংশে অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুফল ভোগ করিতেছে মানুষ, অন্যদিকে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে নির্মাণকাজের মন্থর গতিতে জনদুর্ভোগের আশঙ্কা দেখা দিয়াছে। এই দুই মিলাইয়া ঈদযাত্রীদের এক মিশ্র অনুভূতির সৃষ্টি হইয়াছে।

সিরাজগঞ্জ অংশের সংবাদটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। যমুনা সেতুর পশ্চিমপাড় হইতে হাটিকুমরুল পর্যন্ত ১১টি উড়ালসেতু এবং সার্ভিস রোড চালু হওয়া আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনায় এক বিশাল মাইলফলক। বিগত এক দশকে এই পথে যাত্রীদের যে অবর্ণনীয় ভোগান্তি পোহাইতে হইয়াছে, চার লেনের পূর্ণাঙ্গ সুবিধা ও আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থার মাধ্যমে তাহার অবসান ঘটিবে বলিয়া আমরা বিশ্বাস করি। বিশেষ করিয়া, সিসি ক্যামেরা ও ড্রোন ব্যবহার করিয়া মহাসড়ক পর্যবেক্ষণ করিবার উদ্যোগটি আধুনিক ও সময়োপযোগী। লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধকরণ এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ নিশ্চিত করা গেলে সিরাজগঞ্জ অংশে এইবার এক ঐতিহাসিক স্বস্তিদায়ক ঈদ যাত্রা সম্ভবপর হইবে।

এইদিকে মুদ্রার উলটা পিঠ হইল গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ অংশ। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ছয় লেন ও উড়ালসড়ক নির্মাণকাজ নির্দিষ্ট সময়ের তিন বৎসর পরেও সমাপ্ত না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। পান্তাপাড়া হইতে মহিলা কলেজ পর্যন্ত মাত্র দুই কিলোমিটার এলাকায় নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ ও সরু বিকল্প পথ এখন উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীদের জন্য আতঙ্কের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের এই দীর্ঘসূত্রতা কেবল সাধারণ মানুষের ভোগান্তিই বাড়াইতেছে না, বরং ঈদের সময় এই জনপদকে এক বিশাল যানজটের জালে আবদ্ধ করিবার ক্ষেত্র প্রস্তুত করিতেছে। যদিও প্রশাসন ১৫ হইতে ২৫ মার্চ পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখিবার সিদ্ধান্ত লইয়াছে, তথাপি বর্তমান অবস্থার উন্নয়ন না ঘটিলে কেবল কাজ বন্ধ রাখিয়া যানজট নিরসন করা কতটুকু সম্ভব, তাহা লইয়া প্রশ্ন থাকিয়া যায়।

উত্তরের এই ঈদ যাত্রাকে নির্বিঘ্ন করিতে হইলে গোবিন্দগঞ্জে যেইখানে টিন দিয়া ঘেরা রহিয়াছে, সেই সকল স্থানে রাস্তার দুই পার্শ্ব হইতে দ্রুত বালু ও নির্মাণসামগ্রী সরাইয়া রাস্তা চলাচলের উপযোগী করিতে হইবে। সিরাজগঞ্জের ন্যায় গোবিন্দগঞ্জেও অতিরিক্ত পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েনের পাশাপাশি ড্রোন বা প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি বৃদ্ধি করিতে হইবে। যদিও গাইবান্ধা প্রশাসক ইত্তেফাককে জানাইয়াছেন যে, সেইখানে ইতিমধ্যে পুলিশকে সংযুক্ত করা হইয়াছে এবং গোবিন্দগঞ্জ চৌরাস্তায় স্থাপন করা হইতেছে পুলিশ বক্স। তবে ইহার পাশাপাশি যানজট তীব্র আকার ধারণ করিলে ছোট যানবাহনের জন্য পূর্বনির্ধারিত বিকল্প বাইপাস সড়ক সচল রাখিতে হইবে। মহাসড়কের যে কোনো স্থানে কোনো গাড়ি বিকল হইলে তাহা দ্রুত সরাইবার জন্য পর্যাপ্ত রেকার বা ক্রেন মজুত রাখিতে হইবে।

আমরা মনে করি, যে কোনো জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রকল্প যথাসময়ে সম্পন্ন করা প্রয়োজন। ইহাতে জনগণের অর্থের সদ্ব্যবহার যেমন হইবে, তেমনি তাহাদের দুর্ভোগ কমিয়া গিয়া তাহারা উপকৃত হইবেন। এই জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প পরিচালকের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা দরকার। আলোচ্য ক্ষেত্রে কেন দীর্ঘ কয়েক বৎসরেও ফ্লাইওভার বা উড়ালসড়কের নির্মাণকাজ শেষ হইল না, তাহার তদন্ত করিয়া দায়ীদের বিরুদ্ধে নিয়মমাফিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক, যাহাতে ভবিষ্যতে উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ সাধারণ মানুষের গলার কাঁটা না হইয়া দাঁড়ায়।

পরিশেষে ইহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে, সরকারের সদিচ্ছা ও অবকাঠামোগত উন্নতির সুফল উত্তরবঙ্গের মানুষ পাইতে শুরু করিয়াছে। তবে গোবিন্দগঞ্জের ন্যায় বিচ্ছিন্ন কিছু অব্যবস্থাপনা যেন সমগ্র সফলতাকে স্নান না করিয়া দেয়, সেই দিকে নজর দিতে হইবে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি সিরাজগঞ্জের ন্যায় গোবিন্দগঞ্জেও কঠোর ও সুশৃঙ্খল নজরদারি নিশ্চিত করিতে পারে, তবেই ২০২৬ সালের এই ঈদ যাত্রা সত্যই এক দশকের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ঈদ যাত্রায় পরিণত হইবে।