যেন জলে কুমির, ডাঙ্গায় বাঘ। বাংলায় ব্যবহৃত প্রবাদের মতো উভয়কূল সংকটে কথা জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলেরা। তারা বলছেন, ইদানীং সময়ে সাগরে দেখা গেছে মাছের তীব্র সংকট। সেই সঙ্গে বেড়েছে জলদস্যুদের আনাগোনা। তাছাড়া নদীতে ভাসমান পাম্পগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে জ্বালানি সংকট।
এই পরিস্থিতিতে কক্সবাজারের মৎস্য শিল্পে স্থবিরতা নেমে এসেছে। তাই লোকসান এড়াতে অধিকাংশ ট্রলার মালিক তাদের বোট নোঙর করে রেখেছেন বলে জানিয়েছেন জেলেরা। এতে জেলাজুড়ে কয়েক লাখ জেলে পরিবার এখন চরম অর্থ সংকটে দিন কাটাচ্ছে।
কক্সবাজার জেলা মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি শওকত ওসমান ফারুক জানান, প্রতিটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে ডিজেল ও রসদ বাবদ প্রায় ৪ লাখ টাকা খরচ হয়। গত মাসে দুটি ট্রলার পাঠিয়ে প্রায় ৭ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। বর্তমানে সাগরে মাছের দেখা না মেলায় অধিকাংশ মালিক নতুন করে ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না।
মৎস্য নেতাদের অভিযোগ, আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ফিশিং ট্রলিগুলো বঙ্গোপসাগরকে মৎস্য শূন্য করে তুলছে।
ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আহমদের দাবি, এসব ট্রলিগুলো নাবিকদের দ্বারা পরিচালিত হয়। ট্রলিতে থাকা রাডারের সহায়তায় মাছের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে তারা বিশেষ কায়দায় ছোট-বড় সব ধরনের মাছ ধরে ফেলে। এতে মা ও বাচ্চা মাছ ধ্বংস হওয়ায় প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, সাগরে থাকা এসব ট্রলি ৪০ মিটার গভীরতায় মাছ শিকারের কথা থাকলেও তারা জাল ফেলে ৮-১০ মিটার গভীর সাগরে। ফলে, কাঠের ফিশিং ট্রলার মাছের দেখা পাচ্ছে না। ধারাবাহিক লোকসান সইতে না পেরে মালিকরা বাঁকখালী নদীর তীরে বোটগুলো সারি সারি করে বেঁধে রেখেছেন।
বোট মালিক সমিতির নেতা মোস্তাক বলেন, আমরা সৃষ্টির সেরা জীব হলেও আমাদের মানসিকতা ক্রমে নষ্ট হচ্ছে। দেশে কিংবা বিদেশে কোন ধরণের দুর্যোগ দেখা দিলে আমরা মজুদদারিতে নেমে পড়ি। ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেল নিয়েও তেমনটি শুরু হয়েছে। জলে-স্থলে বিদ্যমান তেল পাম্পগুলোতে জ্বালানি সংকট দেখানো হচ্ছে। একটা নির্ধারিত পরিমাণের বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। আবার বাড়তি দাম পরিশোধ করলে আবার চাহিদা মতো তেল মিলছে। তাই প্রশাসনের উচিত কোন অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে কি না সজাগ দৃষ্টি রাখা।
এদিকে পেট্রোল পাম্প মালিকরা বলছেন, কক্সবাজার উপকূলের মাছ ধরার ট্রলারের জন্য ২১টি পেট্রোল পাম্প রয়েছে। এসব পাম্পে মাসে অন্তত ১০লাখ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। সপ্তাহখানেক ধরে নদীর ভাসমান সব পেট্রোল পাম্পে পর্যাপ্ত ডিজেল নেই। অনেক পাম্প কার্যক্রম প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।
বাঁকখালী নদীর ফিশারিঘাট-৬নংঘাট-বিআইডাব্লিউটিএ ঘাট এলাকায় দেখা যায়, শ'খানেক বোট সারি সারি করে নোঙ্গর করা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বোটের তত্ত্বাবধায়ক আহমদ কবির বলেন, আমাদের একাধিক বোট রয়েছে। গত দুই ট্রিপে অল্প পরিমাণ মাছ নিয়ে কূলে ফিরেছি। মালিকের বড় লস হয়েছে। এরপরও আবার সাগরে যাবার চিন্তা ছিল। কিন্তু ডিজেল নিয়ে আবার লুকোচুরি খেলা হচ্ছে। তেল নেই বলে, অল্প পরিমাণ দিতে চাই। কিন্তু গোপনে বাড়তি টাকা দিলে আবার তেল মিলে। একদিকে সাগরে মাছ নেই, অপর দিকে ডিজেল নিয়ে বাহানায় বোট আর নামানো হয়নি।
ফিশিং ট্রলার সংশ্লিষ্ট ফিশারিঘাট এলাকার ব্যবসায়ী আবু নাঈম বলেন, অশ্বশক্তি ভেদে কোনো বোট ১৮শ থেকে ২ হাজার আবার বড়গুলো সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার লিটার তেল নিয়ে সাগরে যায়। এখন অতটা তেল দেওয়া হচ্ছে না। তেল-আর মাছের চেয়ে সাগরে আরেকটি সংকট হলো জলদস্যু। তারা অকস্মাৎ হামলা ও লুটপাট চালিয়ে মাছ, রসদ ও দামি মালামাল নিয়ে যায়। এতসব যন্ত্রণা হজম করতে না পেরে ধীরে ধীরে অনেক বহদ্দার (বোট মালিক) ফিশিং বোট ব্যবসা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে।
বাঁকখালী নদীর উপকূলে থাকা ২১টি ভাসমান পেট্রোল পাম্পের জ্বালানি তেলের সরবরাহের ওপর নির্ভর করে কক্সবাজারের কয়েক হাজার মাছ ধরার ট্রলার চলে। এসবের মাঝে কিছু কিছু পাম্প কয়েকদিন ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে। চালু রয়েছে বৃহৎ তেলের পাম্প চেয়ারম্যানঘাট এলাকার ফারিয়া ট্রেডিং।
পাম্পটির ম্যানেজার রিয়াজ উদ্দিন বলেন, সপ্তাহখানেক ধরে তেলের সংকট চলছে। আমাদের পাম্পে প্রতিদিন ন্যূনতম প্রায় ৯ হাজার লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তেল সরবরাহ একেবারেই কম। তাই মাছ ধরার ট্রলারে চাহিদা মতো তেল দিতে পারছি না।
কোস্টগার্ডের টেকনাফ স্টেশন ইনচার্জ লেফটেন্যান্ট কমান্ডার শাহিন আলম জানান, কক্সবাজারের মহেশখালী ও কুতুবদিয়া সমুদ্র দিয়ে জ্বালানি তেল পাচার ও জলদস্যুদের অপতৎপরতা রোধে বিশেষ অভিযান অব্যহত রয়েছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কোস্টগার্ডের আওতাধীন নাফ নদী ও সমুদ্র সীমান্ত এলাকায় সব ধরনের জলযান ও সন্দেহজনক গতিবিধি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সমুদ্র এলাকায় ডাকাত ও জলদস্যু নির্মূলে এবং মৎস্য আহরণে থাকা জেলেদের সার্বিক নিরাপত্তায় সাঁড়াশি অভিযান চলমান।
তিনি আরও জানান, গত দুই মাসে কোস্টগার্ডের একাধিক বিশেষ অভিযানে ৪টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৭টি দেশীয় অস্ত্র, ৬ রাউন্ড তাজা কার্তুজসহ ৩০ জন ডাকাত ও জলদস্যুকে আটক করা হয়েছে। এসময় ডাকাতের কবলে জিম্মি থাকা ৩২ জন জেলেকেও জীবিত উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।