ইত্তেফাক রিপোর্ট
রচনায় তিনি রেখে গেছেন স্বপ্ন-কল্পনা-প্রেম। প্রাণে দিয়ে গেছেন সুর ও আলোর স্পর্শ আর শুভচেতনা। তার গান গেয়ে শিল্পী সেই স্বপ্ন, সেই সুর, সেই শুভচেতনার বাণী পৌঁছে দিতে চাইলেন দর্শক-শ্রোতার হূদয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবসে তার গান, কবিতাকে অবলম্বন করে দুঃসময়কে সম্মিলিতভাবে অতিক্রম করার আহ্বান জানালেন শিল্পীরা। আহ্বান জানালেন পৃথিবী থেকে হিংসা দূর করে সবার প্রাণে মনুষ্যত্বের বাণী পৌঁছে দেওয়ার। মঞ্চে মঞ্চে উগ্রপন্থার অন্ধকারের বিরুদ্ধে রবির সৃজন আলোর প্রেরণায় জীবনের জয়গান গাইবার প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন শিল্পী, সাহিত্যিকগণ। গতকাল ছিল কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস, বাইশে শ্রাবণ। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গানে, কবিতা ও আলোচনায় তাকে স্মরণ করল বিভিন্ন সংগঠন। তার অমর সাহিত্য, সংগীতের নানা পরিবেশনার মধ্য দিয়ে এই মনীষীর কীর্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানাল সবাই।
ছায়ানট:ছায়ানটের আয়োজনে রবীন্দ্র প্রয়াণ দিবসে প্রধান মিলনায়তনে বসেছিল রবীন্দ্র স্মরণ অনুষ্ঠান। এতে ছায়ানটের শিল্পীরা পরিবেশন করেন রবীন্দ্রনাথের গীতিনৃত্যনাট্য ‘শ্যামা’। কণ্ঠশীলনের ছিল দুইটি পরিবেশনা। প্রথমে ছিল ধর্ম ও দেশপ্রেম নিয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ, কবিতা ও গানের আলোকে নির্মিত ‘আমি তোমায় ছাড়ব না মা’। এই পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করেন প্রদীপ আগরওয়ালা, ফারহানা নিশাত সেহেলী, নাফিসা কেয়া, সাহেরা, ইসরাত জাহান ও আসিফ চৌধুরী। এরপর ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘কর্ণকুন্তী’ সংবাদ। এতে অংশ নেন শামীমা নাজনীন ও জহিরুল হক খান।
বাংলা একাডেমি:রবীন্দ্র প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষ্যে গতকাল বিকালে একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে একক বক্তৃতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। এতে ‘রবীন্দ্রজীবনে ১৯১৯ : তাত্পর্যপূর্ণ একটি বছর উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও সাহসী অবস্থান’ শীর্ষক বক্তৃতা করেন অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। স্বাগত ভাষণ দেন একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ড. মালেকা বেগম, পশ্চিমবঙ্গের গবেষক শক্তিসাধন মুখোপাধ্যায়, কবি লিলি হক প্রমুখ।
অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক বলেন, বিশ্বভারতীর মধ্য দিয়ে যে বিশ্বাত্মবোধ রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টি করতে চেয়েছেন, সেখানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জ্ঞানচর্চার মিলনই ছিল তাঁর একান্তভাবে কাম্য। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী শান্তি ও মানবিক মহত্ত্ব সৃষ্টিতে আকুল রবীন্দ্রনাথ জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নিজের শানিত অবস্থান ব্যক্ত করে মূলত তাঁর জীবনব্যাপী সাধনার শুভ পারম্পর্যকেই বজায় রেখেছেন।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে একাকী এবং সুদৃঢ় অবস্থান অন্যায়ের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের জীবনব্যাপী অঙ্গীকারেরই প্রমাণবহ। মনুষ্যত্বের অপমান নিজ দেশে কিংবা পৃথিবীর যেখানে সংঘটিত হয়েছে সেখানেই তিনি স্বাদেশিকতা-স্বাজাতিকতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রেরণায় তার প্রতিবাদ করেছেন।
হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ দিবসে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে বলতে হয় জীবনের মতো মৃত্যুকেও তিনি আবিষ্কার করেছেন অমৃত করে। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন মহত্ মানবাত্মার কোনো বিলয় নেই।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রবীন্দ্র-কবিতা আবৃত্তি করেন বাচিক শিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন মহিউজ্জামান চৌধুরী ও অণিমা রায়। তবলায় সঙ্গত করেন এনামুল হক ওমর, গিটার বাজিয়েছেন রিচার্ড কিশোর এবং কী-বোর্ডে ছিলেন এ বি এম তানভীর আলম সজীব।