ছেলেধরা গুজবে গণপিটুনি
জামিউল আহসান সিপু
‘আমের কেজি কত?’— এক যুবকের এমন জিজ্ঞাসায় দোকানদার রিয়াজ ক্রেতার সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়ে দেন। রিয়াজের অভিযোগ, ক্রেতা ছিলেন কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ। বেশভূষায় একটু পাগল পাগল ভাব। স্বাভাবিকের চেয়ে একটু ধীরে কথা বলেন। এতে দোকানদার রিয়াজ আরো উত্তেজিত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে রিয়াজ ক্রেতাকে মারতে উদ্যত হন। এরই মধ্যে আবুল কালাম নামে আরেক ব্যক্তি চিত্কার করে বলে ওঠে—‘এরা কল্লা কাটা গ্রুপ। পদ্মা সেতুর জন্য বাচ্চার মাথা খুঁজছে এরা।’ এ কথা বলামাত্র ৫/৬ জন লোক তাকে পেটাতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে আরো ৩০/৪০ জন জড়ো হয়ে ওই যুবককে গণপিটুনি দিতে থাকে। ইট দিয়ে যুবকের মাথা থেঁতলে দেওয়া হয়। আধা ঘণ্টা পর পুলিশ যখন ঘটনাস্থলে যায়, তখন সব শেষ। গুজবকে কেন্দ্র করে রবি উল্যাহ (২৩) নামের ওই যুবককে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে গত ৯ জুলাই রাতে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ আম দোকানদার রিয়াজ ও একটি বাড়ির মেস ম্যানেজার আবুল কালামকে গ্রেফতার করে এক দিনের রিমান্ডে নেয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়েছে।
গত ৯ জুলাই গণপিটুনিতে নিহত রবি উল্যাহর লাশ ‘অজ্ঞাত পরিচয়’ যুবক হিসাবে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গের মরচুয়ারিতে পড়ে থাকে তিন দিন। এরপর পুলিশ নিহতের ফিঙ্গার প্রিন্ট জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভারের সঙ্গে মিলিয়ে নাম-পরিচয় শনাক্ত করে। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানার গুটিঘর গ্রাম থেকে রবিউল্যাহর বাবা মোস্তফা ঢাকায় এসে ছেলের লাশ শনাক্ত করেন। ঘটনার পর রবি উল্যাহর চাচা বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় অজ্ঞাত ৪০/৫০ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন।
পারিবারিক সূত্র জানায়, রবি উল্যাহ একটু সহজ সরল প্রকৃতির ছিলেন। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে রবি উল্যাহ বড় ছিলেন। বাবা দিনমজুরের কাজ করেন। কিন্তু তার একার আয়ে সংসার চলে না। এ কারণে রবি উল্যাহ ঢাকায় এসে বিভিন্ন দোকানে কাজ করেন। মাস শেষে যা বেতন পেতেন, তা নিয়ে চলে যেতেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাবার বাড়িতে। মোহাম্মদপুরে চাঁদ উদ্যান এলাকায় রাতে তিনি মানুষের বাড়ির সামনে অথবা ফুটপাতে ঘুমাতেন।
মোহাম্মদপুর থানার ওসি গোপাল গণেশ বিশ্বাস বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। গণপিটুনিতে রবি উল্যাহ নিহত হওয়ার পর তার পরিবারটি পথে বসেছে। গ্রেফতারকৃত দুই জনের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে আরো ৫/৬ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদেরকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
উল্লেখ্য, ‘পদ্মা সেতুতে মাথা লাগবে’-এমন গুজবে সারাদেশে গণপিটুনিতে ৮ জন নিহত ও ১১১ জন আহত হন। গণপিটুনির ঘটনায় সারাদেশে ৩৬টি মামলা দায়ের হয়। এসব মামলায় পুলিশ ১০৬ জনকে গ্রেফতার করেছে।