বর্ষাকাল এলেই উত্কণ্ঠা বাড়ে দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের পাশাপাশি নদী ভাঙনের শিকার হয়ে প্রতিবছর লাখ লাখ পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। ভূমিহীন এ পরিবারগুলো বেড়িবাঁধের ওপর আশ্রয় নেওয়া ছাড়াও জীবন-জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমায় রাজধানী ঢাকা কিংবা দেশের বড়ো বিভাগীয় শহরগুলোতে। নদী ভাঙনের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখা গেছে, এ অঞ্চলের ১৫টি নদীর কড়াল গ্রাসে বিলীন হয়ে গেছে গ্রামের অনেক এলাকা। গৃহহারা হয়েছে কয়েক লাখ পরিবার।
নগরসংলগ্ন চরবাড়িয়া, চরমোনাই, চরকাউয়া, চরআইচা ও চরবদনার অব্যাহত ভাঙনে ইতিমধ্যে বিপুল সংখ্যক মসজিদ, স্কুল, ইটেরভাটাসহ কয়েক হাজার ঘরবাড়ি কীর্তনখোলা নদীতে বিলীন হয়েছে। চলতি বর্ষা মৌসুমের ভাঙনে হিজলা উপজেলার ধুলখোলা ইউনিয়নের আলীগঞ্জ বাজার, মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙনে মেহেন্দিগঞ্জের শ্রীপুর, আলিমাবাদ, ভাষানচর, গোবিন্দপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বাবুগঞ্জ উপজেলার মধ্যদিয়ে বহমান রাক্ষুসী সন্ধ্যা, সুগন্ধা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভয়াবহ ভাঙনে বিলীন হচ্ছে নদী তীরবর্তী শত শত ঘরবাড়ি, আবাদি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। তীব্র ভাঙনের কবলে রয়েছে বাবুগঞ্জের সৈয়দ মোশারফ-রশিদা একাডেমি, আবুল কালাম কলেজ সংযোগ সড়ক, বেশ কিছু স্থাপনা, বসতবাড়ি, আবাদি জমি, দোকান ঘরসহ কয়েক একর ফসলি জমি ও ফলদ বৃক্ষ। এছাড়া ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর (দোয়ারিকা) সেতু, মহিষাদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, আবুল কালাম ডিগ্রি কলেজ, জামেনা খাতুন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পূর্ব ক্ষুদ্রকাঠি গ্রাম, চরসাধুকাঠি মাদ্রাসা, ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর স্মৃতি জাদুঘর, শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বাবুগঞ্জ বাজার, মীররগঞ্জ ফেরিঘাট ও বাজারসহ বেশকিছু সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা।
গত সোমবার থেকে ভাঙনে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে রাক্ষুসে মেঘনা নদীর গ্রাসে হারিয়ে গেছে ৩০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী আলীগঞ্জ বাজার জামে মসজিদ। আকস্মিক নদী ভাঙন তীব্র হওয়ায় ঝুঁকিতে রয়েছে আলীগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলীগঞ্জ বাজার, আশীঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হিজলা পি এন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বাথুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম পালপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হোগলটুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলীগঞ্জ ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ইউনিয়ন ভূমি অফিসসহ শত শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও ঘরবাড়ি।
গত কয়েক দিনে মেঘনার ভাঙন তীব্র হওয়ায় মেহেন্দিগঞ্জ এবং হিজলার সীমান্তবর্তী আলীগঞ্জ এলাকার মানুষের দিন কাটে আতঙ্কে। মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর, গোবিন্দপুর, উলানিয়া, জাঙ্গালিয়া, ভাষানচর, বাগরজা, শিন্নির চর নদী ভাঙনের কবলে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার পথে। উলানিয়া গ্রামটি এখন মেঘনার ভাঙনে বিলীন হওয়ার পথে। সেখানকার কালিরবাজার নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার পর এখন উলানিয়া মিয়া বাড়ি ও বড়ো বাজার হুমকির মুখে পড়েছে। মেঘনার ভাঙনে পুরান হিজলা, চর মেমানিয়া, মৌলভীরহাট, গঙ্গাপুর, হরিনাথপুর, মল্লিকপুর, বাউশিয়া, বাহেরচর, হিজলা-গৌরবদী ও পালপাড়া গ্রামের কয়েক হাজার ঘর, ১০টি স্কুল এবং তিনটি হাটবাজার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
নগর সংলগ্ন দপপিয়া-নলছিটি সড়কের মল্লিকপুর নামক স্থানে সুগন্ধা নদীর ভাঙনে প্রধান রাস্তা হুমকির সম্মুখীন। বিগত ১০ বছরের ভাঙনে মল্লিকপুরের প্রায় ৫০ একর জমি বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে এ রাস্তাটি নদী গর্ভে বিলীনের পথে। এতে করে বরিশালের সঙ্গে নলছিটি, ঝালকাঠী, মোল্লারহাট, ঘোষকাঠী যাতায়াতের একমাত্র সড়ক পথটি বন্ধ হয়ে যাবে। বাকেরগঞ্জের তুলাতলি নদীর ভাঙনে তুলাতলা, তাণ্ডব, খয়রাবাদ, বেবাজ, কাতিভাঙা এলাকা হুমকির মুখে পড়েছে। ঐ নদীর কড়াল গ্রাসে এখন হুমকির মুখে আছে কলসকাঠী, বোয়ালিয়া, বাখরকাঠী, নীলগঞ্জ, চরামদ্দি এলাকার কয়েক হাজার বাড়িঘর। মেঘনার কড়াল গ্রাসে উলানিয়ার অদূরবর্তী ভোলার বঙ্গের চর, রাজাপুর, দৌলতখান, গুপ্তের বাজার, সৈয়দপুর, ভবানীপুর, এমনকি খোদ ভোলা শহরের নিকটবর্তী ধনিয়া, কাঁচিয়া এখন বিলীন হওয়ার পথে। ভোলা ও বরিশালের মধ্যবর্তী আলিমাবাদ ইউনিয়ন এখন নামেমাত্র ছোট্ট একটি গ্রাম। কালাবদর নদীর স্রোতে এ ইউনিয়নের শ্রীপুরসহ অধিকাংশ গ্রাম বিলীন হয়ে গেছে। পার্শ্ববর্তী চাঁদপুরা ইউনিয়নটি রয়েছে চরম হুমকির মুখে।
বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সাঈদ বলেন, মেহেন্দিগঞ্জের উলানিয়ায় মেঘনা নদীর তীর সংরক্ষণে ১৯০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্পে আলীগঞ্জের ১ হাজার ছয় মিটার নদীর তীর সংরক্ষণ কাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।