রেলে ভোগান্তির নাম ‘সিএনএস’

রেলপথে ভোগান্তি কমাতে ট্রেনের ৫০ শতাংশ টিকিট অনলাইনে বিক্রির  ব্যবস্থাটি রীতিমতো যাত্রী ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কম্পিউটার  নেটওয়ার্ক সিস্টেম (সিএনএস) লিমিটেড বাংলাদেশ ‘রেলসেবা’ নামে একটি অ্যাপ চালু করে। কাউন্টারে রেলওয়ের টিকিট বিক্রির সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনা ও অনলাইনে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের বিরুদ্ধে যাত্রীদের অভিযোগের সীমা নেই।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, কাউন্টারে টিকিট বিক্রির সফটওয়্যার পরিচালনা করে কমিশন বাবদ টিকিটপ্রতি ৫ টাকা পায় সিএনএস। অনলাইন ও  মোবাইল অ্যাপে টিকিট বিক্রি হলে সেখান থেকে পায় টিকিটপ্রতি ২৫ টাকা। কাউন্টার, অনলাইন ও অ্যাপের টিকিট ব্যবস্থাপনা বাবদ মোটা অঙ্কের কমিশন পেলেও যন্ত্রণাদায়ক ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সিএনএস। দিন যত যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অভিযোগ তত বাড়ছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলেছে, সিএনএসের কার্যক্রমের ওপর খোদ রেল কর্তৃপক্ষেরই নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি আছে। টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে রেলওয়ের নীতিমালাও অনুসরণ করে না তারা। শুধু অদক্ষতাই নয়; কোম্পানিটির কর্মীরা জড়িয়ে পড়েছেন দুর্নীতিতে।

এ প্রসঙ্গে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘সিএনএসের সঙ্গে আমাদের চুক্তি আছে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে আমরা যদি দেখি তারা কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, তাহলে তাদের সঙ্গে চুক্তি আর নবায়ন করা হবে না। এদিকে ভিড়ে ওঠাও যায় না, যাত্রীর এত চাপ, তারপরও প্রতিবছর কেবল বেড়েই চলেছে লোকসান। রেলওয়েকে ঢেলে সাজাতে আট বছর আগে ‘রেলপথ মন্ত্রণালয়’ নামে স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় গঠন, রেল বাজেট বৃদ্ধি হলেও একের পর এক স্টেশন বন্ধ, মেয়াদোত্তীর্ণ রোলিং স্টক, জরাজীর্ণ রেল কারখানা, লোকবলের সংকট, সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারা, টিকিট পেতে ভোগান্তি, ভাঙা-নোংরা আসন, যাত্রীদের নিম্নমানের খাবার পরিবেশন আর সব মিলিয়ে অত্যন্ত নিম্নমানের যাত্রীসেবা থেকে এখনো বের হতে পারছে না রেলওয়ে। গত ৯ বছরে রেল পরিচালনায় ব্যয় হয়েছে ১৭ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা। আর আয় হয়েছে ৮ হাজার ১৪৮  কোটি টাকা। অর্থাত্, লোকসান হয়েছে ৯ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। গত বছরই রেলওয়ের নিট লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৮৫২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।

বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক  ড. শামসুল হক বলেন, রেলের সবচেয়ে বড় সমস্যা সঠিক ব্যবস্থাপনা। সঙ্গে আছে দুর্নীতি। রেলওয়ের স্বয়ংক্রিয় কারিগরি ব্যবস্থাপনা ও উন্নত কর্মী ব্যবস্থাপনা ছাড়া রেলওয়ের সেবার মান কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছানো যাবে না।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, লিজে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া ট্রেনগুলো লাভ করছে। ক্ষেত্রবিশেষে মুনাফার অঙ্ক সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা সময়ের চেয়ে ১৮০ শতাংশ বেশি। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লাইনে লিজের ‘ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লোকাল’ ট্রেনটি বছরে রেলকে দিচ্ছে ৬ কোটি ২৪ লাখ ৫৯ হাজার ২৮০ টাকা। অথচ লিজ প্রদানের আগে বছরে আয় হতো ২ কোটি ৯৫ লাখ ৮৬ হাজার ৯৬০ টাকা। রেলে বর্তমানে ২১টি ট্রেন বেসরকারি খাতে চলাচল করছে। ২১টি ট্রেন প্রতিদিন ৭৬টি ট্রিপ দিচ্ছে। লোকাল এসব ট্রেনে বছরে প্রায় ৬০ কোটি টাকা রেলকে পরিশোধ করছে। লিজের আগে এসব ট্রেন বছরে আয় করত মাত্র ২৪ কোটি টাকা।

রেলসচিব মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, ‘রেলে বিনিয়োগের সঙ্গে আয়ের সম্পর্ক নেই। এটা গণপরিবহন। সরকার মানুষের সেবা দিতে চালায় রেল। এখানে মুনাফার জন্য রেল চালায় না সরকার। এ ছাড়া রেলের ভাড়া তো ইচ্ছা করলেই আমরা বাড়াতে পারব না।’