বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় ডোবা থেকে উদ্ধার হওয়া দুই মাস বয়সী হাতির শাবকটি অসুস্থতা বা পাহাড় থেকে পড়ে গিয়ে মারা যায়নি, বরং এটিকে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভেটেরিনারি সার্জন মোস্তাফিজুর রহমান।
কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের এই চিকিৎসক শাবকটির ময়নাতদন্ত শেষে নিশ্চিত করেছেন, এর মাথায় ও শরীরে স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তার ধারণা, কোনো শক্ত বস্তু বা পাথর দূর থেকে ছুড়ে মারার কারণে শাবকটি মাথায় মারাত্মক আঘাত পায়।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) বিকেলে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের বটতলা মুসলিমপাড়া এলাকার একটি ডোবা থেকে এই মৃত শাবকটি উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শাবকটির শরীরের ভেতরে অন্য কোনো অসুস্থতার লক্ষণ পাওয়া যায়নি, যা সরাসরি হত্যাকাণ্ডকেই নির্দেশ করে।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনার বর্ণনায় ভেটেরিনারি সার্জন উল্লেখ করেছেন, আহত শাবকটির যন্ত্রণা লাঘব এবং পানি খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা হিসেবেই হয়তো মা হাতিটি সেটিকে ডোবায় নিয়ে গিয়েছিল। গত মঙ্গলবার স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথম শাবকটির মরদেহ ডোবায় পড়ে থাকতে দেখেন।
সেই সময় থেকে টানা তিন দিন ধরে মা হাতি এবং দলের একটি পুরুষ হাতি মৃত শাবকটির পাশে শোকাতুর অবস্থায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিল। এই করুণ দৃশ্য দেখে বন বিভাগের কর্মকর্তা এবং সাধারণ মানুষ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিন দিন পর শোকার্ত হাতি দুটি ঘটনাস্থল থেকে সরে গেলে বন বিভাগ শাবকটির মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করে।
বন বিভাগ এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করেছে। কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন যে, ময়নাতদন্তের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ পাওয়ার পর থেকেই নবজাতক হাতির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের শনাক্ত করতে কাজ চলছে।
বর্তমানে কক্সবাজারের রাজারকুল রেঞ্জ কর্মকর্তা এবং লামা-নাইক্ষ্যংছড়ির রেঞ্জ কর্মকর্তা যৌথভাবে এই তদন্ত প্রক্রিয়া পরিচালনা করছেন। বন্যপ্রাণী হত্যার এই ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদীরা। বন্যহাতির বিচরণক্ষেত্রে মানুষের হস্তক্ষেপ এবং এমন নৃশংসতা ওই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
নাইক্ষ্যংছড়ির এই ঘটনাটি পাহাড়ে হাতি ও মানুষের দ্বন্দ্বের এক করুণ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। স্থানীয়দের মতে, হাতি দম্পতি তাদের সন্তানের শোকে যেভাবে তিন দিন একস্থানে দাঁড়িয়ে ছিল, তা বিরল এক শোকের উদাহরণ হয়ে থাকবে।
এখন বন বিভাগের মূল লক্ষ্য হলো ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হাতি চলাচলের পথে কারা এবং কেন এমন পাথর বা শক্ত বস্তু ছুড়ে মেরেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।