খার্গ দ্বীপ পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান। ইরানের জন্য এটি কেবল একটি দ্বীপ নয়; বরং দেশের অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার হৃৎপিণ্ড হিসেবে কাজ করে। দ্বীপটির অবস্থান হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি, যা বিশ্বের তেল পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ। এই ভৌগোলিক অবস্থানই খার্গকে আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
খার্গ দ্বীপের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৬০-এর দশকে, যখন ইরান এই দ্বীপকে তেল রপ্তানির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। প্রাথমিকভাবে সীমিত অবকাঠামোর মাধ্যমে তেল রপ্তানি করা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দ্বীপটির গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় দ্বীপটি বহুবার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। ১৯৯০- এর দশক থেকে আধুনিকীকরণ প্রকল্প চালু হয়, যার মাধ্যমে স্টোরেজ ট্যাংক, জেটি, পাইপলাইন এবং সমুদ্রপথের গভীরতা উন্নত করা হয়। ফলে দ্বীপটি আন্তর্জাতিক মানের তেল রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
খার্গ দ্বীপের ভূপ্রকৃতি ও গঠনপ্রক্রিয়াও এর গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি মূলত প্রবাল দ্বারা গঠিত, যার কারণে আশপাশের সমুদ্রপথ গভীর এবং বড় ট্যাংকার গ্রহণের উপযোগী। দ্বীপে নির্মিত জেটি, পাইপলাইন এবং স্টোরেজ ট্যাংক আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে তৈরি করা হয়েছে, যা ধারাবাহিক তেল রপ্তানি নিশ্চিত করে।
বিশ্বের জ্বালানি ব্যবস্থায় চারটি গুরুত্বপূর্ণ চোক পয়েন্ট রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি প্রণালি – হরমুজ, সুয়েজ খাল এবং মালাক্কা প্রণালি বিশ্বব্যাপী পরিচিত। এর পাশাপাশি খার্গ দ্বীপও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়। সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা টার্মিনাল এবং মালাক্কা প্রণালির মতো স্থাপনাগুলো আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে খার্গ দ্বীপের বিশেষত্ব হলো, এটি সরাসরি হরমুজ প্রণালির পাশে অবস্থিত, যা একদিকে সামরিক নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয় এবং অন্যদিকে তেলের সরবরাহে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
খাৰ্গ দ্বীপ কৌশলগত উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনার কারণে দ্বীপটি সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে, ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ও একাধিক আক্রমণের পর দ্বীপটি সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েনি। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান দ্বীপটির নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরো আধুনিক করেছে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং নৌ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে।
সম্ভাব্য হামলার প্রভাব হবে অত্যন্ত মারাত্মক। দ্বীপের অবকাঠামো; যেমন ট্যাংকার স্টোরেজ, পাইপলাইন এবং জেটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তেলের সরবরাহ ব্যাহত হলে বৈশ্বিক বাজারে দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। এশিয়ার বড় আমদানিকারক দেশ যেমন চীন, ভারত ও জাপান সরাসরি প্রভাবিত হবে। এর ফলে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্প খাতের ব্যয় বেড়ে যাবে। সরবরাহ চেইন ব্যাহত হলে খাদ্য, ওষুধ এবং শিল্প কাঁচামালের মূল্যও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি নৌপরিবহন ও জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে।
দৈনিক প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ ব্যারেল তেল এই দ্বীপের মাধ্যমে রপ্তানি হয়, যা ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৮০- ৯০ শতাংশ। উল্লেখ্য, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০-২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। ফলে খার্গ দ্বীপের কার্যক্রমে যে কোনো বিষণ্ণ কেবল ইরান নয়, বরং বৈশ্বিক তেলবাজারেও সরাসরি প্রভাব ফেলবে। দ্বীপের ভেতরে বিস্তৃত পাইপলাইন ও সংযোগব্যবস্থা রয়েছে, যা বড় ধরনের আঘাতের মধ্যেও কার্যক্রম চালু রাখতে সহায়ক।
এই প্রেক্ষাপটে খার্গ দ্বীপে সামরিক সংঘাত, অবরোধ বা দখলের ঘটনা ঘটলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে তাৎক্ষণিক ধাক্কা লাগবে। গবেষণা অনুযায়ী, বৈশ্বিক সরবরাহে মাত্র ৫-১০ শতাংশ ঘাটতি সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৮-১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। কিন্তু খার্গ দ্বীপের মতো গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি কেন্দ্র সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে সরবরাহে ২-৩ শতাংশ বৈশ্বিক ঘাটতিও ১৫-২৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি ঘটাতে পারে। এমনকি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১২০ মার্কিন ডলার অতিক্রম করতে পারে, যা ২০২২ সালের জ্বালানিসংকটের সময় দেখা গিয়েছিল।
তেলের মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, তেলের দাম প্রতি ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যয় গড়ে ২-৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এর ফলে পরিবহন খরচ ৫-১২ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ৩.৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এই ব্যয় বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়।
খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব উল্লেখযোগ্য। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি ব্যয়ের বৃদ্ধি খাদ্য পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে খাদ্যদ্রব্যের দাম ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দ্রুত ত্বরান্বিত হয়, যা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করে।
এই ধরনের সংকট আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। জ্বালানি মূল্য অস্থিরতার কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায় এবং বৈশ্বিক পুঁজি প্রবাহে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে অস্থিরতা বৃদ্ধি পায় এবং উৎপাদননির্ভর শিল্পগুলো ক্ষতির মুখে পড়ে।
খার্গ দ্বীপে সম্ভাব্য সংঘাত কেবল একটি আঞ্চলিক ঘটনা নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলতে পারে। সরবরাহ ব্যাহত হলে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হওয়া, বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাওয়ার মতো ঝুঁকি একসঙ্গে দেখা দেবে। তাই এই কৌশলগত কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৈশ্বিক সম্প্রদায়কে কৌশলগত প্রস্তুতি নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক সংলাপ বৃদ্ধি, বিকল্প জ্বালানি উৎসের ব্যবহার এবং সরবরাহ চ্যানেলের বহুমুখীকরণ জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বৃদ্ধি করে এই ঝুঁকি আংশিকভাবে কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে খার্গ দ্বীপে সম্ভাব্য আক্রমণ বা অস্থিতিশীলতা সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলবে জ্বালানি নির্ভরতা তত্ত্ব এবং সাপ্লাই শকের মাধ্যমে। বাংলাদেশ বর্তমানে তার মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর, এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও প্রায় ৬৫ শতাংশ জ্বালানি আমদানি থেকে আসে। ফলে খার্গ দ্বীপ এবং হরমুজ প্রণালিতে কোনো সংঘাত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ কমে যাবে, যা সরাসরি বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়াবে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪৭-৪৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে জ্বালানি আমদানিতে, এবং বৈশ্বিক মূল্য বৃদ্ধি পেলেও আমদানি কমলেও ব্যয় কমেনি। এই পরিস্থিতিতে তেলের দাম ১০-২০ শতাংশ বাড়লে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি হবে, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং টাকার অবমূল্যায়ন ত্বরান্বিত হতে পারে, যা সামষ্টিক অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি (খরচ বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি) বাড়াবে।
দ্বিতীয়ত, খাৰ্গ দ্বীপে আক্রমণের ফলে সৃষ্ট সরবরাহ সংকট বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও বাণিজ্যে সরাসরি আঘাত হানবে, যা ইনপুট কস্ট ট্রান্সমিশন থিওরি দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায়। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটে দেখা গেছে, জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশে জাহাজ বিলম্ব, জ্বালানি রেশনিং এবং শিল্প উৎপাদনে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি হয়ে টেক্সটাইলসহ প্রধান রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যেখানে দৈনিক কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিং পর্যন্ত হয়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, যা খাদ্য ও কৃষি খাতে প্রভাব ফেলে; কারণ
সেচ ও উৎপাদনে ডিজেলের ব্যবহার ব্যাপক। ফলে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ার মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে। এই ধরনের বহুমাত্রিক প্রভাব বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিকে দ্রুত একটি স্ট্যাগফ্লেশন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আমদানি নির্ভরতা হ্রাসের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যেমন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, সুনির্দিষ্ট জ্বালানি মজুত তৈরি, এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসের ব্যবহার বাড়ানো। এছাড়া সরকার তেল ও গ্যাস আমদানিতে বৈদেশিক চ্যানেল বহুমুখীকরণ এবং সরবরাহ চেইনকে আরো শক্তিশালী করার জন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীর সঙ্গে চুক্তি করছে।
তবে খার্গ দ্বীপ বা হরমুজ প্রণালিতে কোনো সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা মোকাবিলা করার জন্য আরো কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে, তেলের আমদানির বিকল্প রুট ও উৎসের বিস্তৃতি বৃদ্ধি, দেশের অভ্যন্তরীণ তেল ও জ্বালানি মজুত বৃদ্ধির মাধ্যমে সরবরাহ বিঘ্ন মোকাবিলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি; যেমন সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণ, এবং শিল্প খাতে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে খরচ কমানো। এছাড়া বিদেশি বাজারে তেলের অস্থিরতার প্রভাব হ্রাস করতে কৌশলগত হেজিং এবং বৈদেশিক বিনিময় রিজার্ভ ব্যবস্থাপনাকে আরো কার্যকর করা জরুরি। এসব পদক্ষেপ একসঙ্গে গ্রহণ করলে বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা আরো স্থিতিশীল হবে, সম্ভাব্য সরবরাহ শকের প্রভাব সীমিত হবে এবং দেশে মূল্যস্ফীতি ও শিল্প ক্ষতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে। বাংলাদেশের এই প্রয়াস বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
• লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিষ্ট