পারস্য-সভ্যতার ঐশ্বর্যের বিপরীতে ধ্বংস মানসিকতা

মানবসভ্যতার ইতিহাস কেবল অগ্রগতির সরলরেখা নহে-ইহা উত্থান-পতনের জটিল সমাবেশ। আজ যখন পৃথিবীর এক প্রান্তে মানুষ মহাকাশের অনাবিষ্কৃত অন্ধকার ভেদ করিবার দুরূহ প্রয়াসে নিয়োজিত, অন্য প্রান্তে তখন মানুষই মানুষের বিরুদ্ধে ধ্বংসের হুমকি উচ্চারণ করিয়াছে এই বলিয়া যে, একটি দেশকে 'প্রস্তরযুগে ফিরাইয়া লইয়া যাওয়া হইবে!' ইহা কেবল রাজনৈতিক বাক্য নহে; ইহা চেতনার গভীরে লুক্কায়িত এক ভয়ংকর পশ্চাদপসরণের প্রতিধ্বনি। এই বৈপরীত্যের প্রেক্ষাপটে প্রাচীন পারস্য-সভ্যতার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিলে আমরা এক বিস্ময়কর শিক্ষা লাভকরি।

পারস্য আকেমেনিড সাম্রাজ্য মানব ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। প্রায় আড়াই সহস্রাব্দ পূর্বে, যখন বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চল রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত ও সাংস্কৃতিকভাবে অপরিণত, তখন এই সাম্রাজ্য একটি সুবিশাল ভূখণ্ডকে এক প্রশাসনিক ছাতার অন্তর্গত করিয়া পরিচালনা করিয়াছিল। ইহার প্রতিষ্ঠাতা সাইরাস দ্য গ্রেট কেবল বিজয়ের নেশায় মত্ত ছিলেন না; বরং তিনি উপলব্ধি করিয়াছিলেন, শক্তির স্থায়িত্ব নিহিত থাকে ন্যায়, সহিষ্ণুতা ও মানবিকতার ভিতের উপর। পারস্য শাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সহনশীলতা। বিভিন্ন জাতি ও বিশ্বাসের মানুষ তাহাদের নিজস্ব রীতিনীতি বজায় রাখিবার স্বাধীনতা পাইয়াছিল। ইতিহাসে উল্লিখিত আছে, বিজিত জাতিগণের প্রতি এই সহিষ্ণু মনোভাবই পারস্যকে কেবল সামরিক শক্তি নহে, বরং এক নৈতিক শক্তি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিল। আজকের বিশ্বে, যেইখানে ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজন ক্রমশ তীব্র হইতেছে, সেইখানে এই দৃষ্টান্ত আমাদের জন্য এক অমূল্য শিক্ষা। প্রশাসনিক দিক হইতেও পারস্য-সভ্যতা যুগান্তকারী। প্রদেশভিত্তিক শাসনব্যবস্থা, দক্ষ কর সংগ্রহ এবং 'রয়‍্যাল রোড'-এর ন্যায় উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ইহাদের রাষ্ট্রযন্ত্রকে করিয়াছিল সুসংগঠিত ও গতিশীল। একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের অধীনে এত বিস্তৃত ভূখণ্ড পরিচালনা করিবার জন্য যে শৃঙ্খলা, দূরদৃষ্টি ও তথ্যনির্ভরতা প্রয়োজন, পারস্য তাহার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছিল শত শত বৎসর পূর্বেই। এই দৃষ্টান্ত আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পূর্বসূরি বলিয়া বিবেচিত করিয়া থাকেন অনেক ঐতিহাসিক।

অথচ বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকাইলে আমরা এক গভীর বৈপরীত্য প্রত্যক্ষ করি। মানুষ আজ অ্যাপোলো ১১ চন্দ্রাভিযানের উত্তরাধিকারী হইয়া মহাকাশে বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা করিতেছে; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিনপ্রযুক্তি ও মহাকাশবিজ্ঞান আমাদের সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন করিয়াছে; কিন্তু ইহার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা ক্রমাগত সংঘাত, অবিশ্বাস ও শক্তিপ্রদর্শনের এক অশুভ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। প্রশ্ন জাগে-ইহাই কি সভ্য মানসিকতা বলা যাইবে? যুদ্ধোন্মাদ বিশ্বে আমরা দেখিতেছি যুক্তির পরিবর্তে উগ্র আবেগ, সহযোগিতার পরিবর্তে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নির্মাণের পরিবর্তে ধ্বংসের প্রবণতা প্রাধান্য পাইতেছে।

এই প্রেক্ষাপটে পারস্য-সভ্যতা আমাদের নিকট এক আয়নার ন্যায় প্রতিভাত হয়। আড়াই হাজার বৎসর পূর্বে, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, তাহারা যেই সহিষ্ণুতা, প্রশাসনিক প্রজ্ঞা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রদর্শন করিয়াছিল, আজকের তথাকথিত উন্নত বিশ্ব কি তাহার সমতুল্য কোনো নৈতিক উচ্চতা অর্জন করিতে পারিয়াছে? যদি না পারিয়া থাকে, তাহা হইলে আমাদের অগ্রগতি কেবল বাহ্যিক-অন্তর্গত নয়। মানবসভ্যতার এই দ্বৈত রূপ-একদিকে আর্টেমিস-২-এর মহাকাশ অভিযাত্রী, অন্যদিকে ধ্বংসে উন্মত্ত-আমাদের এক গভীর আত্মসমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করায়। পারস্যের ঐশ্বর্য কেবল তাহার প্রাসাদ, পথ বা সামরিক শক্তিতে নহে-ইহা নিহিত ছিল তাহার মানসিক ও নৈতিক পরিপক্বতায়। আজ যদি আমরা সত্যই উন্নত হইতে চাই, তাহা হইলে প্রযুক্তির পাশাপাশি সেই নৈতিক ভিত্তিকেও পুনরুদ্ধার করিতে হইবে। এখন প্রশ্ন হইল, আমরা কি সভ্যতার ইতিহাস হইতে শিক্ষা গ্রহণ করিব, নাকি অসভ্য-অহংকারে অন্ধ হইয়া পুনরায় প্রস্তরযুগের মানসিকতায় প্রত্যাবর্তন করিব? সিদ্ধান্ত আজ আমাদের; কিন্তু তাহার পরিণতি বহন করিবে সমগ্র মানবজাতি।