আজ পহেলা বৈশাখ—বাঙালির প্রাণের উৎসব, সময়ের চক্রে নূতন এক সূচনার দ্বারোদ্ঘাটন; কিন্তু এই সূচনা কেবল দিনপঞ্জির পাতায় নহে; ইহা এক গভীর আত্মিক ও সাংস্কৃতিক প্রত্যাবর্তনের প্রতীক। বসন্তের দহন শেষে যখন গ্রীষ্মের রৌদ্র প্রকৃতিকে ফলের প্রাচুর্যে ভরিয়া তোলে, তখনই বাংলা নববর্ষ আমাদের মনে করাইয়া দেয়—জীবনও তদ্রূপ এক অবিরাম রূপান্তরের ধারায় প্রবাহিত। কাঁচা হইতে পাকা, অজ্ঞতা হইতে প্রজ্ঞা, বিচ্ছিন্নতা হইতে ঐক্য—এই যাত্রাপথই নববর্ষের অন্তর্নিহিত দর্শন।
পহেলা বৈশাখের উৎসব আজ নানা সীমাবদ্ধতায় হয়তো সংকুচিত হইয়াছে; হালখাতা, বৈশাখী মেলা, গ্রামীণ প্রাণের উৎসবসমূহের অনেক আয়োজনই আর পূর্বের ন্যায় সম্ভব নহে। তথাপি উৎসবের বাহ্যিক রূপ ক্ষীণ হইলেও তাহার অন্তর্গত চেতনাটি অম্লান রহিয়াছে। কারণ, এই নববর্ষ কেবল এক ঐতিহাসিক প্রবর্তনের ফল নহে; ইহা বাঙালির সত্তায় নিবিড়ভাবে মিশিয়া যাওয়া এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, মোগল সম্রাট আকবর কৃষি ও রাজস্ব ব্যবস্থাকে সুসংহত করিবার প্রয়োজনে ‘তারিখ ইলাহি' প্রবর্তন করেন, যাহা পরবর্তীকালে ‘বঙ্গাব্দ’ রূপে পরিচিতি লাভ করে। এই সালের সূচনা ছিল অর্থনৈতিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে; কিন্তু কালক্রমে ইহা রূপান্তরিত হইয়াছে এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনে। এই রূপান্তরই প্রমাণ করে—মানুষ কেবল প্রয়োজনের দাস নহে, সে অর্থের অতিরিক্ত অর্থ নির্মাণ করিতে সক্ষম। আর সেই নির্মাণের মধ্য দিয়াই জাতিসত্তা গঠিত হয়।
বাংলা নববর্ষ আমাদের শিখায় সহিষ্ণুতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সাম্যের বোধ। এই দিনটিতে জাতি, ধর্ম, বর্ণের সকল বিভাজন যেন মুছিয়া যায়; মানুষ মানুষকে আপন করিয়া লইতে শেখে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আহ্বান—‘মুছে যাক গ্লানি, মুছে যাক জরা’–শুধু ঋতুর পরিবর্তনের কথা নহে; ইহা আমাদের অন্তরের অশুচিতা দূর করিবার এক নৈতিক নির্দেশ। একইভাবে কাজী নজরুল ইসলামের প্রলয়োন্মত্ত আহ্বান—“তোরা সব জয়ধ্বনি কর’–আমাদের মনে করাইয়া দেয়, নূতনের আগমন সর্বদাই এক শক্তিশালী আন্দোলনের ফল।
বর্তমান বিশ্ব এক গভীর অস্থিরতার মধ্য দিয়া অতিক্রম করিতেছে। যুদ্ধ, জলবায়ু বিপর্যয়, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক বিভাজন আমাদের সভ্যতাকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলিয়া দিতেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলা নববর্ষ কেবল আনন্দের উপলক্ষ্য নহে; ইহা এক দার্শনিক আহ্বান—আমরা কে, আমাদের শেকড় কোথায় এবং আমরা কোন পথে যাইতেছি—এই প্রশ্নগুলির মুখোমুখি দাঁড়াইবার। প্রকৃত অর্থে, নববর্ষের মূল শিক্ষা হইল আত্মপরিচয়ের অন্বেষণ। আমরা ক্রমাগত আধুনিকতার মোহে, বিশ্বায়নের প্রবাহে ভাসিয়া যাইতেছি; কিন্তু এই প্রবাহে আমাদের নিজস্বতা যেন বিলুপ্ত হইয়া না যায়। বাংলা নববর্ষ সেই হারানো পরিচয়ের দিশা দেখায়। ইহা আমাদের মাটির গন্ধ চিনিতে শিখায়, আমাদের ইতিহাসের সহিত সংযুক্ত করিয়া রাখে। উল্লেখ থাকে যে, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এই সময়েই নববর্ষ উদযাপিত হয়—ইরানের নওরোজ, মধ্য এশিয়ার উৎসবসমূহ, এমনকি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংক্রান। এই সমান্তরাল উৎসবধারা আমাদের মনে করাইয়া দেয়, আমরা এক বৃহত্তর সাংস্কৃতিক স্রোতের অংশ। ভৌগোলিক সীমারেখা ভিন্ন হইলেও মানবসভ্যতার অন্তর্গত অনুভবগুলি একসূত্রে গাঁথা।
বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখের তারিখ নির্ধারণেও আধুনিক পঞ্জিকা সংস্কারের ভূমিকা রহিয়াছে। বিজ্ঞানী মেঘনাথ সাহা ও পরবর্তীকালে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে যে সংস্কার সাধিত হইয়াছে, তাহা আমাদের সময়বোধকে আরো সুসংহত করিয়াছে; কিন্তু তাহার চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ হইল—এই দিনটি আমাদের সম্মিলিত চেতনার প্রতীক হইয়া উঠিয়াছে। এই কারণে বাংলা নববর্ষ কেবল উৎসব নহে—ইহা এক আত্মজিজ্ঞাসার দিন : আমরা কি আমাদের শিকড়ের প্রতি দায়বদ্ধ? আমরা কি আমাদের মানবিক মূল্যবোধ সংরক্ষণ করিতে পারিতেছি? সময়ের আহ্বান আজ সৌহার্দের, সহমর্মিতার এবং মানবিক ঐক্যের। নববর্ষ আমাদের সেই পথেই আহ্বান জানায়— যেইখানে মানুষ মানুষকে চিনিবে, আপন করিয়া লইবে এবং বিভাজনের প্রাচীর ভাঙিয়া একত্রে আগামীর পথে অগ্রসর হইবে।
সকলের জীবনে নূতন দিনের আলো উদ্ভাসিত হউক—শুভ নববর্ষ।