বাঙালি সংস্কৃতির বহমান স্রোত

ঐতিহ্য, অবক্ষয় ও অযাচিত বিতর্ক

বাংলা নববর্ষ বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণস্পন্দন। এটি কেবল বর্ষ—পরিক্রমার সূচনা নয়; বরং ভাষা, জাতিসত্তা ও আবহমান ঐতিহ্যের এক গভীর প্রতীক। সংকটাকীর্ণ জীবনের ভেতর নতুন আশার আলো জ্বালিয়ে মানুষ এই দিনে নতুন করে স্বপ্ন বুনতে শুরু করে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রবল প্রভাবের মাঝেও পহেলা বৈশাখ বাঙালির হৃদয়ে অবিচলভাবে দোলা দেয়। পুরাতনকে ঝেড়ে ফেলে নতুনকে বরণ করার যে চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা, নববর্ষ তারই এক প্রাণময় প্রকাশ।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের আহ্বান—‘এসো, হে বৈশাখ’-এই চেতনাকেই প্রতিধ্বনিত করে। মঙ্গল শোভাযাত্রার বর্ণিল আয়োজন, গ্রামবাংলার চিরচেনা পথ, নদী, হাট-বাজার-সব মিলিয়ে এই উৎসব আমাদের গভীরভাবে আলোড়িত করে।

সংস্কৃতি কোনো স্থির সত্তা নয়, এটি মানুষের যাপিত জীবনের নিরন্তর রূপান্তরিত প্রতিচ্ছবি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো বদলে যেতে পারে, কিন্তু একটি জাতিকে তার শেকড়ে ধরে রাখে তার সংস্কৃতি। হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সংস্কৃতির যে গৌরব আমরা ধারণ করি, তার বর্তমান রূপটি কতটা নির্মল-এই প্রশ্ন আজ জরুরি। গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আমরা এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি—ঐতিহ্যের অহংকার, নৈতিক অবক্ষয় এবং সংস্কৃতির ওপর অপ্রয়োজনীয় কাঠামোগত হস্তক্ষেপের এক অস্বস্তিকর মিশ্রণে।

পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির সবচেয়ে সর্বজনীন ও ধর্মনিরপেক্ষ রূপ। ধর্মীয় উৎসবগুলো কখনো কখনো অদৃশ্য বিভাজনরেখা টেনে দেয়, কিন্তু নববর্ষ সেই দেয়াল ভেঙে দেয়। এখানে মানুষ শুধু মানুষ হয়ে ওঠে-ধর্ম, বর্ণ বা শ্রেণির সীমা অতিক্রম করে। ‘তোমার উৎসব, আমার উৎসব’—এই বিভেদকে অস্বীকার করে পহেলা বৈশাখ আমাদের এক অভিন্ন বৃত্তে নিয়ে আসে। এটি মাটির সঙ্গে, শেকড়ের সঙ্গে পুনর্মিলনের এক উন্মুক্ত আহ্বান।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ। এই নিজস্বতার ভেতর দাঁড়িয়েই নববর্ষকে বরণ করা উচিত। অন্ধ অনুকরণে বিদেশি সংস্কৃতির ছাঁচে নিজেকে গড়ে তোলার কোনো প্রয়োজন নেই। বাঙালি মুসলিম বা হিন্দু—সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রয়েছে একটি সামগ্রিক সাংস্কৃতিক সত্তা, যা এই ভূখরে মাটি, জল ও মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নিয়েছে। সেই সত্তাকে অক্ষুণ্ণ রাখাই আমাদের দায়িত্ব।

ঐতিহাসিকভাবে ফসলি সন হিসেবে যাত্রা শুরু হলেও বাংলা নববর্ষ আজ আত্মপরিচয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সম্রাট আকবরের খাজনা ব্যবস্থার প্রয়োজন থেকে জন্ম নেওয়া এই পঞ্জিকা আজ বাঙালির অসাম্প্রদায়িক উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু। পান্তা-ইলিশ, হালখাতা, বৈশাখী মেলা, লাঠিখেলা—এসব লোকজ উপাদান এই উৎসবকে করে তোলে জীবন্ত। পাকিস্তানি শাসনামলে যখন ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত নেমে এসেছিল, তখন এই নববর্ষই হয়ে উঠেছিল প্রতিরোধের শক্তি-এক ধরনের সাংস্কৃতিক অস্ত্র, যা জাতিসত্তাকে জাগ্রত রেখেছিল।

তবে একটি বাস্তবতা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। আমরা অনেকেই নববর্ষে লোকজ সাজে নিজেদের উপস্থাপন করি, কিন্তু যারা এই উৎসবের মূল প্রাণ—সেই কৃষক সমাজের কথা কতটা ভাবি? যারা রোদে-জলে, দুর্যোগে-সংগ্রামে ফসল ফলিয়ে আমাদের জীবনের ভিত্তি নির্মাণ করেন, তাদের অবস্থার দিকে আমরা কি যথেষ্ট দৃষ্টি দিই? নববর্ষের এই লগ্নে তাদের জীবন-বাস্তবতার কথাও স্মরণ করা প্রয়োজন।

সমসাময়িক সমাজে অসহিষ্ণুতা, স্বার্থপরতা ও ভ্লামির যে প্রবণতা বাড়ছে, তা আমাদের সংস্কৃতির জন্য উদ্বেগজনক। মুখে নীতির কথা বলেও বাস্তবে তার বিপরীত আচরণ করা, ধর্মকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করা-এই দ্বিচারিতা আমাদের সামাজিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ঐতিহ্যের উদারতা ও সহনশীলতা আজ যেন সংকীর্ণতার কাছে পরাজিত হচ্ছে।

এই প্রবণতার প্রভাব পড়ছে নববর্ষের মতো সর্বজনীন উৎসবেও। মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক, রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ-এসব বিষয় উৎসবের স্বাভাবিক আনন্দকে ব্যাহত করছে। শোভাযাত্রা ‘মঙ্গল’, ‘আনন্দ’ না ‘বৈশাখী’—এই নামকরণ নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ সংস্কৃতির স্বতঃস্ফূর্ততাকে ক্ষুণ্ণ করে। প্রকৃতপক্ষে, সংস্কৃতি কোনো নির্দিষ্ট নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের অংশগ্রহণেই প্রাণ পায়।

সংস্কৃতি স্বতঃস্ফূর্ততার বিষয়। এটি কোনো প্রশাসনিক নির্দেশে নয়, বরং মানুষের সম্মিলিত চর্চায় বিকশিত হয়। রাষ্ট্রের ভূমিকা এখানে সহায়ক হওয়া উচিত, নিয়ন্ত্রক নয়। ইউনেস্কো ২০১৬ সালে মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে—এটি আমাদের গর্বের। এই স্বীকৃতি প্রমাণ করে, পহেলা বৈশাখ কেবল একটি উৎসব নয়; এটি মানবিক মূল্যবোধের এক বৈশ্বিক প্রতীক।

নদী যেমন স্রোতহীন হলে মৃত হয়ে যায়, তেমনি সংস্কৃতিচর্চা ছাড়া মানুষও প্রাণহীন হয়ে পড়ে। বর্তমানের দুর্নীতি, তোষামোদ ও সংকীর্ণতার যে সংস্কৃতি, তা বাঙালির প্রকৃত পরিচয় নয়। আমাদের শেকড়ের দিকে ফিরে যেতে হবে, মোনাফেকির এই আবরণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

মনে রাখা দরকার, শেকড়ের এই উৎসবে অংশগ্রহণ মানুষকে নিঃস্ব করে না; বরং তাকে সমৃদ্ধ করে। সংস্কৃতি মানুষকে উদার করে, তাকে ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে তুলে আনে। যারা মনে করেন, নববর্ষ উদযাপন করলে বিশ্বাস বা নৈতিকতা ক্ষুণ্ণ হয়, তারা এক ভুল ধারণায় আবদ্ধ। প্রকৃত সংস্কৃতিচর্চা মানুষকে আত্মিকভাবে উন্নত করে—তাকে কেবল ‘মানুষ’ হিসেবে দেখতে শেখায়।

পহেলা বৈশাখ তাই কেবল একটি উৎসব নয়; এটি এক মানবিক জাগরণ। এটি আমাদের শেখায়-পুরাতনকে বিদায় দিয়ে নতুনকে গ্রহণ করতে, বিভেদ ভুলে মিলনের পথে হাঁটতে। তাই আসুক বৈশাখ-সমতার বেশে, নতুন আলোর আহ্বানে; জরা-জীর্ণতা পুড়িয়ে দিয়ে জাগিয়ে তুলুক বাঙালির অন্তরে অন্তরে ঐক্যের অমল সুর। শুভ নববর্ষ।