মাগুরার আঞ্চলিক শব্দ ও লোককথা

গ্রামপ্রধান বাংলাদেশের সমাজ মূলত গ্রামীণ। সংখ্যা ছিল খুবই কম। এ দেশের গ্রাম মানে এক ধরনের 'স্থির, শান্ত ও অচঞ্চল' ছবি। কালের প্রবল স্রোত নগরের রাজনীতি ও অর্থনীতির পরিকাঠামো বদলে দিয়েছে; কিন্তু গ্রামীণ সমাজ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অনেকাংশে তার নিজস্ব ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। পরিবর্তনের হাওয়া বয়ে যায়, অনেক কিছু বদলায়, তবু গ্রাম যেন নিজের ভেতরের এক প্রাচীন সুর বাঁচিয়ে রাখে-এটাই গ্রামের বৈশিষ্ট্য। বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ যথার্থই বলেছেন, 'অবিরত গ্রহণ-বর্জনের মধ্য দিয়েই ভাষা অগ্রসর হয়; এটি কালের স্বাভাবিক নিয়ম।'

আধুনিকায়ন ও সমাজ-রূপান্তরের ফলে এই গ্রহণ-বর্জনের প্রক্রিয়া আরো ত্বরান্বিত হয়েছে। উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের কারণে যেমন বহু পুরোনো শব্দ হারিয়ে যাচ্ছে, তেমনি যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন শব্দ। মাগুরা জেলার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানকার মানুষ 'ক্ষেত'কে বলে 'তুই', 'কাটতে'কে 'কাটতি', 'খেজুর'কে 'খাজুর', 'স্নান'কে 'চান'। আবার প্রবাদের গ্লারেও রয়েছে নিজস্বতা-'ঘর জামাই ভাগনা, তিন নয় আপনা', 'পরের ধনে পোদ্দারি, লোকে বলে সরদারি'। বিয়ের গীত থেকে শুরু করে কান্নার সুরেও ধরা পড়ে আলাদা ভাষা ও সুরের পরিচয়। তবু দুঃখের বিষয়, জেলার লোকসাহিত্য নিয়ে কিছু কাজ হলেও বিপুল অংশ এখনো অজানার অন্ধকারে রয়ে গেছে।

মাগুরার গ্রামীণ জীবনে লোকবিশ্বাসের উপস্থিতি অত্যন্ত লক্ষণীয়। যেমন-একজন নারী আরেকজনের চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে যদি হঠাৎ চিরুনি ফেলে দেন, কিংবা দুজন একসঙ্গে একই কথা বলে ফেলেন, তখন ধরে নেওয়া হয় অতিথি আসবে। এমনকি হাত থেকে ভাতের থালা বা গ্লাস পড়ে গেলেও সেটাকেও অতিথি আগমনের পূর্বলক্ষণ মনে করা হয়। একইভাবে, পরীক্ষায় যাওয়ার আগে সন্তানকে ডিম না খাওয়ানোর প্রথাও প্রচলিত-ডিমকে শূন্যতার প্রতীক ভেবে 'শূন্য' নম্বর পাওয়ার আশঙ্কা থেকেই এই বিশ্বাসের জন্ম।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কালের বিবর্তনে পুরোনো শব্দের জায়গা দখল করে নেয় নতুন শব্দ। এর পেছনে বড় কারণ বাহ্যিক পরিবর্তন, প্রযুক্তির প্রসার এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। সাম্প্রতিক সময়ে এই পরিবর্তন এত দ্রুত ঘটছে যে ভাষাও যেন নতুন ছাঁচে নিজেকে গড়ে নিচ্ছে। গ্রামীণ জীবনেও এসেছে বহুবিধ পরিবর্তন-মাটির ঘর ও ছনের চালের পরিবর্তে এখন আধাপাকা কিংবা পাকা বাড়ি, চুলার বদলে সিলিন্ডার গ্যাস। ফলে সংশ্লিষ্ট শব্দগুলোও ধীরে ধীরে ব্যবহারের বাইরে চলে যাচ্ছে।

একইভাবে পেশা ও জীবনধারার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে বহু শব্দ। স্থান, ঘর-বাড়ি, কৃষিকাজ, গৃহস্থালি সামগ্রী, রান্নার উপকরণ, খাদ্য, এমনকি দেশীয় অস্ত্র ও নৌকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অসংখ্য শব্দ আজ বিলুপ্তপ্রায়। যেমন-পালান,
দুয়াল, মেটেল, কুম, ডোবা; হাতনে, খুটি, চাঙ; গোয়ারা, টেঙি, ঢেঁকি; জালা, মালশা, ধামা; ডেকচি, পাটা, ঘুটে; ছালুন, জাউ, খুদ-এসব শব্দ একসময় ছিল জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ সেগুলো স্মৃতির ভাঁজে আশ্রয় নিয়েছে।

লোকবিশ্বাসের ক্ষেত্রেও মাগুরা ব্যতিক্রম নয়। যাত্রার সময় হাঁচি, হোঁচট খাওয়া, দরজার চৌকাঠে মাথা লাগা-এসবকেই অশুভ লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। আবার সামনে বিড়াল দৌড়ে গেলে যাত্রা থামিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার রীতিও প্রচলিত। এগুলোর পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা না থাকলেও লোকসমাজে এগুলোর প্রভাব গভীর।

শিশুদের নিয়েও রয়েছে নানা বিশ্বাস। কেউ যদি কোনো শিশুর দিকে বারবার তাকায় বা অতিরিক্ত প্রশংসা করে, তখন 'নজর লাগা'র আশঙ্কা করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এতে শিশুর স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। এই বিশ্বাসগুলো যুক্তির কঠোর আলোয় টেকে না, কিন্তু মানুষের চেতনায় তারা একধরনের আবেগী সত্য হয়ে বেঁচে থাকে।

প্রবাদ-প্রবচনও মাগুরার লোকজ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। 'প্রবাদ' মানে প্রচলিত উক্তি-যার স্রষ্টা অজানা, কিন্তু প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলে। যেমন- 'শাহাড়ি নেই ননদ নেই, কারে করবো ভর ঘর'-শাসনের অভাবে স্বেচ্ছাচার বোঝায়; 'ভাত বিচারে দাও ঘি, জামাই বিচারে দাও ঝি'-যোগ্যতা অনুযায়ী প্রাপ্য দেওয়া উচিত; 'খাজনা বুঝে বাজনা বাজাও'-সামর্থ্য বুঝে ব্যয় করা প্রয়োজন। এ ধরনের প্রবচন গ্রামীণ জীবনের অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি ও হাস্যরসকে একত্রে ধারণ করে।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শব্দল্লার ও প্রবাদসমূহ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে শোনা অনেক শব্দ নতুন প্রজন্মের কাছে অপরিচিত হয়ে উঠছে। সংস্কৃতি ও জীবনাচারের পরিবর্তন, বস্তুগত উন্নয়ন এবং নগরায়নের প্রভাবে এই বিলুপ্তি অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

তবু একটি প্রশ্ন রয়ে যায়-এই হারিয়ে যাওয়া শব্দগুলো কি শুধু শব্দ, নাকি একেকটি জীবনের গল্প? প্রতিটি শব্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকে একটি সময়, একটি সমাজ, একটি জীবনযাত্রা। তাই এগুলো সংরক্ষণ করা মানে শুধু ভাষাকে নয়, আমাদের ঐতিহ্যকেও রক্ষা করা।
যুগে যুগে পরিবর্তনের ছোঁয়ায় শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়েছে-এ কথা সত্য। কিন্তু সেই সমৃদ্ধির ভিড়ে যেন আমাদের শিকড় হারিয়ে না যায়। গ্রামবাংলার

আদি সংস্কৃতি, আঞ্চলিক ভাষা ও লোকজ ঐতিহ্য যদি আমরা সচেতনভাবে সংরক্ষণ করতে পারি, তবে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে। ভাষা তখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম হবে না; হয়ে উঠবে স্মৃতি, ইতিহাস ও পরিচয়ের জীবন্ত ধারক।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক