প্রতিবেশী চীন ও উত্তর কোরিয়া-ভীতিকে কেন্দ্র করিয়া জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার দীর্ঘকালীন বন্ধুত্বে নতুন করিয়া চিড় ধরিয়াছে। পরিস্থিতি এতটাই বেসামাল যে এই দুই দেশের প্রধান মিত্র আমেরিকা চেষ্টা করিয়াও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখিতে পারিতেছে না। স্মর্তব্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জাপান দক্ষিণ কোরিয়ার অগণিত মানুষকে বলপূর্বক শ্রমদান ও যৌনদাসত্বে বাধ্য করে। জাপানের এহেন অপকর্ম দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় স্মৃতি হইতে কখনো মুছিয়া যায় নাই। গত শতকের নব্বইয়ের দশক হইতে বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক স্বাভাবিক হইতে শুরু করিলেও, দক্ষিণ কোরিয়া কখনোই জাপান কর্তৃক কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাহিবার দাবি হইতে সরিয়া আসে নাই। পক্ষান্তরে, জাপান ক্ষমা চাহিবার বিষয়টি জাতীয় মর্যাদার জন্য হানিকর মনে করে। দেশটি মনে করে, নানা সময়ের নানা ধরনের ক্ষতিপূরণের মধ্য দিয়া দক্ষিণ কোরিয়ার দাবির প্রতি যথেষ্ট সম্মান দেখানো হইয়াছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়া যে তেমন কিছু ভাবিতেছে না, তাহাই এইবারের ঘটনাপ্রবাহ হইতে প্রমাণিত হইয়াছে।
গত শুক্রবার জাপান দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্পকারখানার জন্য প্রয়োজনীয় নানা ধরনের পণ্যের রপ্তানি ধীরগতি করিবার হুমকি প্রদান করে। বস্তুত, জাপানের অতি-জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে অনেকটা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধাঁচে বাণিজ্য-অস্ত্র প্রয়োগ করিয়া দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ের চেষ্টা করিয়াছেন। এই চেষ্টার অংশ হিসাবে কিছুদিন পূর্বে তিনি অনির্ধারিত নিরাপত্তা ঝুঁকির অজুহাত দেখাইয়া দক্ষিণ কোরিয়ার নিকট সেমিকন্ডাকটর ও টেলিভিশনের ডিজিটাল ফ্লাট স্ক্রিন বানাইনার রাসায়নিক রপ্তানির ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেন। জাপানের এহেন আচরণ দক্ষিণ কোরিয়াতে প্রবল জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগের জন্ম দেয়। কেবল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে নহে বরং ১৯১০ হইতে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জাপানের শাসনাধীন থাকাকালে দুঃসহ স্মৃতিগুলিও নতুন করিয়া সামনে আসিয়া পড়ে। জাপানের ঘোষণাগুলিকে ‘অর্থনৈতিক আগ্রাসন’ হিসাবে চিহ্নিত করিয়া রাস্তায় নামিয়া আসিয়াছে দেশটির জনগণ। এহেন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জেই-ইন আর কোনোদিন জাপানের নিকট পরাজিত না হইবার অঙ্গীকার ব্যক্ত করিয়াছেন। এইখানেই শেষ নহে। প্রয়োজন বোধ করিলে দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের চুক্তি হইতে সরিয়া আসিবার হুমকিও দিয়াছেন। এই হুমকি কেবল জাপানকে নহে, বরং আমেরিকাকেও ভীষণভাবে ভাবাইয়া তুলিবে বলিয়া মনে করিতেছেন অনেক বিশ্লেষক। উল্লেখ্য, চীন ও উত্তর কোরিয়াকে সামালে রাখিয়া গোটা অঞ্চলের উপরে প্রভাব জারি রাখিবার জন্য এই দুই দেশের সুসম্পর্ক আমেরিকার জন্য অতীব জরুরি।
বিগত দশকগুলিতে দুই দেশের মধ্যে অতীত বিষয়ে বিরোধ বাধিলে আমেরিকাকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে মুরুব্বির ভূমিকায় দেখা গিয়াছে। এইবার শুরুর দিকে ট্রাম্প এই বিষয়টি লইয়া মাথা ঘামাইতে চাহেন নাই। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাইতে থাকিলে মাঠে নামিয়া খুব একটা সুবিধা করিতে পারিতেছে না ট্রাম্প প্রশাসন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, দুই মিত্রের মধ্যে মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে সুবিধা করিতে না পারাটাও আমেরিকার ক্ষমতা হ্রাস পাইতে থাকিবার আরেকটি প্রমাণ।