বলা সহজ, শোনা নহে

ইতিহাসের অন্তরালে যুগে যুগে নৈঃশব্দ্যিক পরিস্থিতি বারংবার জন্ম লইয়াছে। সেই সময়ে দেখা যায়—যাহাদের কর্ণে প্রয়োজনীয় যেই সকল বাণী পৌঁছাইবার কথা, তাহাদের নিকট তাহা আর পৌছাইতেছে না। ফলে প্রশ্ন জাগে—কাহাকে বলা যায় এবং বলিলেই-বা কে শুনিবে?

প্রাচীন ব্যাবিলনের এক অধ্যায়ে দেখা যায়, জ্ঞান যেন নিজেই নিজের ছায়া হইয়া উঠিয়াছে। পুরোহিত ও রাজশক্তির পারস্পরিক-নির্ভরতা এমন এক পরিসর নির্মাণ করিয়াছিল, যেইখানে সত্য প্রকাশের পূর্বেই নিজেকে গোপন করিতে বাধ্য হইত। জ্যোতির্বিজ্ঞানী নক্ষত্রের ভাষা পাঠ করিত, তর্কবিদ যুক্তির অঙ্গন প্রসারিত করিত; কিন্তু এই সমস্ত আবিষ্কার যেন বাতাসে মিলাইয়া যাইত। কারণ, গ্রহণের জন্য প্রয়োজন ছিল এক উন্মুক্ত মন, আর সেই মনই তখন অনুপস্থিত। ফলে জ্ঞান জন্ম লইত; কিন্তু টিকিয়া থাকিত না।

একই রকম এক নীরব সংকটের প্রতিফলন আমরা পাই প্রাচীন গ্রিসে, সক্রেটিসের পরিণতিতে। তিনি প্রশ্ন করিয়াছিলেন—মানুষের আচরণের ভিত্তি কী, ন্যায় কাহাকে বলে? এই প্রশ্নগুলি সহজ ছিল না, বরং প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে আলোড়িত করিবার ক্ষমতা রাখিত; কিন্তু সমাজের একাংশ সেই আলোড়নকে বিপজ্জনক বলিয়া বিবেচনা করিল। ফলত, প্রশ্নের উত্তর খুঁজিবার পরিবর্তে প্রশ্নকর্তাকেই নীরব করা হইল।

ইউরোপের মধ্যযুগে তথাকথিত ‘ইনকুইজিশন'-এর সময় এই প্রবণতা আরও সুসংহত আকার ধারণ করে। মতপ্রকাশ তখন কেবল ভিন্নমত নহে, প্রায়শই অপরাধ বলিয়া গণ্য হইত। যে কণ্ঠ সত্যের অনুসন্ধান করিতে চাহিত, তাহার সামনে অদৃশ্য এক প্রাচীর দাঁড়াইয়া যাইত। ফলে আলোর উৎস নিভিয়া যায় নাই; কিন্তু আলোর দিকে চাহিবার অভ্যাসটাই ক্ষীণ হইয়া গিয়াছিল।

ভারতীয় উপমহাদেশেও অনুরূপ দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়াছে। ঊনবিংশ শতকে নবজাগরণের প্রভাতে যখন কিছু মন নূতন প্রশ্ন তুলিতে আরম্ভ করিল, তখন সেই প্রশ্ন সর্বত্র সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয় নাই। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা-বিবাহের পক্ষে যুক্তি উপস্থিত করিলেন—ইহা কেবল সামাজিক সংস্কারের আহ্বান ছিল না, বরং মানবিকতার একটি পুনঃসংজ্ঞা। তথাপি, তাহার প্রস্তাব সর্বসম্মত সমর্থন পায় নাই। সমালোচনা, অবজ্ঞা, এমনকি বিরূপ প্রতিক্রিয়াও তাহার সহযাত্রী হইয়াছিল। তিনি একসময় বলিয়াছিলেন যে, ‘তাহাদের বলিবার অধিকার আছে, আমারও আছে নীরব থাকিবার অধিকার।' রাশিয়ার ইতিহাসে আননা আখমাতোভা দমন-পীড়নের এক কঠিন প্রেক্ষাপটে দাঁড়াইয়া প্রশ্ন করিলেন—‘আমি যদি বলি, কে শুনিবে?'

প্রাচীন সভ্যতাগুলির উত্থান-পতনের বিবরণে আমরা দেখি, শক্তির প্রাবল্য অনেক সময় বাহ্যিক স্থিতি প্রদান করে বটে; কিন্তু অন্তর্গত স্থিতি আসে পারস্পরিক শ্রবণ ও বিনিময়ের মাধ্যমে। যেইখানে এই বিনিময় স্তিমিত হয়, সেইখানে সময়ের প্রবাহে স্থবিরতা অনিবার্য হইয়া উঠে। তবে নীরবতার মধ্যেও এক প্রকার সঞ্চয় ঘটে—অপ্রকাশিত চিন্তা, অনুচ্চারিত বোধ, অনুচ্চারিত প্রশ্ন। ইহারা সকলেই এক অন্তঃসলিলা স্রোতের ন্যায় বহমান থাকে। একটি পাখি যদি নির্জনে গান গায়, আর সেই গান শুনিবার মতো কেহ না থাকে, তাহা হইলেও কি গান সম্পূর্ণ নিষ্ফল হইয়া যায়? সম্ভবত নয়; কারণ সেই সুর নিজের অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করে।

এইখানেই নীরবতার অন্তর্নিহিত কৌশল নিহিত। কখনো কখনো সরাসরি উচ্চারণ অপেক্ষা সংযম অধিক তাৎপর্যপূর্ণ হইয়া উঠে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেইভাবে বলিয়াছেন—‘অনেক কথা যাও যে ব'লে কোনো কথা না বলি', তাহাতে এই ইঙ্গিতই নিহিত যে, ভাষার সীমার বাহিরে গিয়াও একধরনের প্রকাশ সম্ভব। এইভাবে, ইতিহাসের এই নীরব অধ্যায়গুলি আমাদের শিখায়—বলা যত সহজ, শোনা ততই কঠিন। সেই কঠিন কাজ সকলে করিতে পারে না।