ইতিহাসের ইহা এক বিরল সন্ধিক্ষণ

প্রায় দুই বৎসর পূর্বে সংঘটিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান লইয়া ইংরেজি সংবাদপত্র ‘দ্য ডেইলি স্টার' গত ২৭ এপ্রিল সোমবার একটি প্রধান প্রতিবেদন প্রকাশ করিয়াছে । প্রতিবেদনটিতে একটি গভীর উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলিয়া ধরা হইয়াছে । প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত দায়েরকৃত মোট ১ হাজার ৮৫৫টি মামলার মধ্যে ৯০ শতাংশেরও অধিক এখনো তদন্তাধীন রহিয়াছে—প্রায় দুই বৎসর অতিক্রান্ত হইলেও বিচারিক প্রক্রিয়ার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করে নাই। এই মামলাগুলির মধ্যে ৭৯৯টি হত্যাকাণ্ড-সংক্রান্ত এবং অবশিষ্ট ১ হাজার ৫৬টি অন্যান্য অপরাধ, যেমন—হত্যাচেষ্টা প্রভৃতি বিষয়ে দায়ের করা হইয়াছে। অথচ, এই বিপুলসংখ্যক মামলার মধ্যে মাত্র ১৭৬টির তদন্ত সম্পন্ন হইয়াছে (প্রায় ৯.৫ শতাংশ) এবং চার্জশিট প্রদান করা হইয়াছে মাত্র ১৫৬টির ক্ষেত্রে (৮.৪ শতাংশ) । রাজধানী ঢাকায় দায়েরকৃত ৯০৫টি মামলার মধ্যে (যাহার ৫৫৫টি হত্যার অভিযোগ), তদন্ত সম্পন্ন হইয়াছে মাত্র ৪৩টি (৪.৭৫ শতাংশ)।

ইহা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, বিচারিক প্রক্রিয়া কতখানি ধীরগতিসম্পন্ন ও জটিলতায় নিমজ্জিত। আরো উদ্বেগজনক বিষয় এই যে, তদন্ত সম্পন্ন হওয়া ৪৩টি মামলার মধ্যে ১৯টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করিয়া সকল আসামিকে অব্যাহতি দেওয়া হইয়াছে, যাহার মধ্যে ১৩টি ছিল হত্যার মামলা। অর্থাৎ, অভিযোগের যথার্থতা লইয়াই প্রশ্ন উঠিতেছে। আইন বিশেষজ্ঞগণ বলিয়াছেন, বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাতনামা আসামি অন্তর্ভুক্ত করিয়া মামলা দায়ের করিবার ফলে তদন্ত প্রক্রিয়া জটিল ও দীর্ঘায়িত হইয়াছে। অন্যদিকে, এই দীর্ঘসূত্রতা দুই পক্ষকেই ক্ষতিগ্রস্ত করিতেছে—একদিকে নিহতদের পরিবার বিচার পাইবার আশায় অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনযাপন করিতেছে; অন্যদিকে, বহু নিরপরাধ ব্যক্তি মিথ্যা অভিযোগের ভার বহন করিয়া সামাজিক, মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হইতেছে। এই প্রেক্ষাপটে অভিযোগ উঠিয়াছে যে, দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অংশ তৃণমূল স্তরের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও হয়রানির উদ্দেশ্যে এই ধরনের মামলাকে একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করিতেছে । ফলে বিচার নহে, বরং প্রতিশোধ ও নিয়ন্ত্রণই যেন এই প্রক্রিয়ার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যে পরিণত হইতেছে।

এই বিষয়ে আমেরিকান তারকা ‘গ্রাচো মার্কস'-এর একটি বিখ্যাত উক্তি রহিয়াছে । তিনি বলিয়াছিলেন—‘রাজনীতি হইল সমস্যার অনুসন্ধান করা, সর্বত্র তাহার উপস্থিতি খুঁজিয়া বেড়ানো এবং তাহার ভুল নির্ণয় করিবার শিল্প ।' এই উক্তির অন্তর্নিহিত বার্তাটি হইল—সমস্যার সঠিক নির্ণয় ও সমাধানই রাজনীতির মূল লক্ষ্য; কিন্তু যখন সমস্যার সমাধান বিলম্বিত হয়, কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে জটিল করিয়া তোলা হয়, তখন সেই রাজনীতি আর জনকল্যাণমূলক থাকে না—ইহা পরিণত হয় নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিহিংসার যন্ত্রে । ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিহিংসার সর্প মাথা তুলিয়া দাঁড়ায়; কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা তাহা হইতে দেন নাই । তিনি সতর্ক করিয়া বলিয়াছিলেন—‘প্রতিহিংসা মানব-আত্মাকে বিষাক্ত করিয়া তোলে ।' জাতি হিসাবে টিকিয়া থাকিতে হইলে প্রতিহিংসা সর্বাগ্রে বর্জনীয়।

সুতরাং আমরা স্পষ্ট করিয়া বলিতে চাই—সকল ধরনের দুর্বল, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত মামলাগুলিকে পৃথক করিয়া ফেলিতে হইবে। নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি হইতে মুক্তি দিতেই হইবে। মনে রাখিতে হইবে, একটি রাষ্ট্র যখন প্রতিহিংসার বিষে আক্রান্ত হয়, তখন তাহার বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন এবং সামাজিক সম্পর্ক—সকল কিছুই ধীরে ধীরে কলুষিত হইতে থাকে । ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ হইতেও হিংসা ও বিদ্বেষকে মানবসমাজের জন্য সর্বনাশা বলিয়া বিবেচনা করা হইয়াছে। হাদিসে বর্ণিত আছে—এই প্রবৃত্তিগুলি মানুষের সৎকর্মকে ধ্বংস করিয়া দেয় এবং সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে । অতএব, আমরা যদি নৈতিকভাবে সুস্থ মানবিক জাতি হিসাবে নিজেদের গড়িয়া তুলিতে চাই—তাহা হইলে সকল ধরনের প্রতিহিংসার প্রবৃত্তিগুলির বিরুদ্ধে আমাদের সচেতনভাবে অবস্থান গ্রহণ করিতেই হইবে। নচেৎ জাতি হিসাবে আমরা নিজেদের গড়িয়া তুলিতে পারিব না । আমাদের পতন অনিবার্য । আমরা কোন পথে চলিব? প্রতিহিংসা, নাকি জাতির উন্নয়ন? ইতিহাসের ইহা এক বিরল সন্ধিক্ষণ।