প্রতিবাদ না করিলে অত্যাচার দস্তুর!

মানবসমাজে ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্নটি বহু ক্ষেত্রেই প্রতিবাদ-প্রতিরোধ উচ্চকণ্ঠের আওয়াজের মাধ্যমে যেন নির্ধারিত হয়! যে বা যাহারা যত অধিক গলা চড়াইয়া বলিতে পারে, প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ গড়িয়া তুলিতে পারে—তাহারাই যেন বিজয়ী, তাহারাই যেন সকল কিছুর অধিকারী! অন্যদিকে, যাহারা প্রতিবাদ করিতে পারে না, তাহারাই যেন অত্যাচারের শিকার হয়। প্রকৃতির দিকে তাকাইলেই আমরা এই নির্মম সত্যের প্রতীকী চিত্র প্রত্যক্ষ করি। বৃক্ষ, যাহারা নীরবে ছায়া দেয়, ফল দেয়, জীবনধারণের অক্সিজেন জোগায়—তাহারা নিজেদের পক্ষে কোনো দাবি উত্থাপন করে না। এই নীরবতাই যেন তাহাদের অপরাধ। ফলত, কুঠারের আঘাতে তাহারা বিনা প্রতিরোধে মাটিতে লুটাইয়া পড়ে। অবলা প্রাণীরাও একই পরিণতির শিকার—তাহারা ভাষাহীন, সুতরাং অধিকারহীন। মানুষের নির্মিত আইন, নীতি কিংবা নৈতিকতার বৃত্তে তাহাদের স্থান প্রায়শই অনিশ্চিত, কারণ তাহারা নিজেদের পক্ষে সাক্ষ্য দিতে পারে না।

এই প্রতীকী বাস্তবতা মানবসমাজে আরো জটিল আকারে প্রতিফলিত হয়। এইখানে মানুষই মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়; কিন্তু শক্তির ভারসাম্য সর্বদা সমান থাকে না। যেই মানুষ ক্ষমতার নির্ণায়ক বৈশিষ্ট্যগুলি ধারণ করিতে পারে না—অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, সামাজিকভাবে প্রান্তিক, কিংবা সাংস্কৃতিকভাবে নিঃশব্দ—তাহারা যেন একপ্রকার প্রতিবাদহীন ‘বৃক্ষ’ বা ‘অবলা প্রাণী’। তাহাদের উপর অত্যাচার চলিতে থাকে, কারণ তাহারা প্রতিবাদ করিতে অক্ষম, অথবা প্রতিবাদের পরিণতি তাহাদের জন্য আরও ভয়াবহ হইতে পারে। এইখানেই সভ্যতার এক গভীর সংকট উদ্ভাসিত হয়। আমরা নিজেদের উন্নত, মানবিক ও ন্যায়পরায়ণ বলিয়া দাবি করি; কিন্তু বাস্তবে শক্তির অসম বণ্টনই নির্ধারণ করে কে কাহার উপর অত্যাচার করিবে। প্রতিবাদের ক্ষমতা এইখানে একপ্রকার মুদ্রা। ইহা যাহার নিকট আছে, তিনি নিরাপদ; যাহার নাই, তিনি অনিরাপত্তার স্থায়ী নাগরিক।

কিন্তু প্রশ্ন উঠিতে পারে—মানুষ কেন এমন এক কাঠামো নির্মাণ করিল, যেইখানে নীরবতা শাস্তিযোগ্য এবং প্রতিবাদের তীব্র উচ্চারণ পুরস্কৃত হয়? ইহার একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা রহিয়াছে। ক্ষমতা স্বভাবতই প্রতিরোধহীন ক্ষেত্র খুঁজে। যেইখানে বাধা কম, সেখানেই দখল সহজ। ফলে যেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী প্রতিবাদ করিতে পারে না, তাহার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায় সহজে। এই প্রবণতা কেবল ব্যক্তি পর্যায়ে নহে; রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, এমনকি আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও পরিলক্ষিত হয়। তবে ইহা কেবল নিষ্ঠুরতার গল্প নহে। ইহা একপ্রকার সামাজিক অসচেতনতারও চিত্র। অনেক সময় অত্যাচারী ব্যক্তি নিজেও বুঝিতে পারে না যে, সে অন্যায়ের অংশীদার হইতেছে। কারণ সমাজ তাহাকে শিখাইয়াছে—‘যে চুপ থাকে, সে সহ্য করিবার জন্যই আছে।' এই ধারণা যতদিন অটুট থাকিবে, ততদিন নীরবদের প্রতি নির্যাতন অব্যাহত থাকিবে।
অতএব, সমাধান কেবল প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নহে, বরং ইহা প্রতিবাদের ধারণাটিকেই পুনর্বিবেচনার দাবি করে। প্রত্যেকের পক্ষে উচ্চকণ্ঠ হওয়া সম্ভব নহে; কিন্তু সমাজের দায়িত্ব হইল সেই নীরবতার ভাষা অনুবাদ করা। এইখানে নৈতিকতার একটি সূক্ষ্ম কিন্তু মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের বিচারবোধকে কেবল উচ্চারিত শব্দের উপর নির্ভর করিলে চলিবে না—বরং অনুচ্চারিত সংকেত, নীরব আর্তনাদ এবং অদৃশ্য বঞ্চনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হইবে। যেই সমাজ নীরবদের কণ্ঠস্বর শুনিতে শিখে, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে ন্যায়ভিত্তিক সমাজে পরিণত হয়।

সুতরাং, বৃক্ষ ও অবলা প্রাণীর এই প্রতীকী চিত্র আমাদের কেবল সহানুভূতির আহ্বান জানায় না—ইহা আমাদের দায়বদ্ধতার প্রশ্নও তুলে। আমরা কি কেবল শক্তিশালীদের ভাষাই শুনিব, নাকি দুর্বলদের নীরবতাকেও ভাষা দান করিব? বাস্তবিক অর্থে, যেই সমাজে প্রতিবাদের ক্ষমতাই বাঁচিয়া থাকিবার শর্ত, সেই সমাজ প্রকৃত অর্থে স্বাধীন নহে। স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হইবে, যখন নীরবরাও নিরাপদ থাকিবে—যখন প্রতিবাদ না করিলেও কেহ নির্যাতনের শিকার হইবে না। এই আদর্শ হয়তো তৃতীয় বিশ্বের সমাজে প্রতিষ্ঠা করা সহজ নহে; কিন্তু ইহা ব্যতীত একটি রাষ্ট্র, একটি সমাজ, নিজেকে কী করিয়া সভ্য বলিবে?