তরুণ শক্তি থেকে জাতীয় প্রতিরক্ষা: রাষ্ট্রগঠনে বিএনসিসি

রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে তরুণসমাজ। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সেই সুবশাদকে সংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও রাষ্ট্রমুখী করে তোলার প্রশ্ন এখন শুধু শিক্ষানীতির বিষয় নয়, জাতীয় নিরাপত্তারও। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম যেভাবে রাজনৈতিক সচেতনতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সামাজিক সংগঠনের শক্তি প্রদর্শন করেছে, তা প্রমাণ করে যে, দেশের জেনারেশন জেড কেবল একটি ডিজিটাল প্রজন্ম নয়; তারা রাষ্ট্র ও সমাজের গতিপথ প্রভাবিত করার সক্ষমতাসম্পন্ন একটি শক্তিশালী বাস্তবতা।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের শিক্ষার্থী আন্দোলন এই বস্তবতাকে আরো স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তরুশরা যে দ্রুত জনমত গঠন, তথ্য বিনিময় ও সাংগঠনিক সমন্বয় তৈরি করছে, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা। যোগ করেছে। এই শক্তিকে যদি সুশৃঙ্খল, দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত করা যায়, তাহলে তা জাতীয় উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল সম্পদে পরিণত হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) নতুন করে কৌশলগত গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

বাংলাদেশ বর্তমানে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। দীর্ঘ সীমান্ত, অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, উগ্রবাদ, তথাযুদ্ধ, সাইবার হুমকি, জলবায় পরিবর্তন, দুর্যোগ ও সামাজিক অস্থিরতা-সব মিলিয়ে জাতীয় নিরাপত্তার ধারণা এখন আর শুধু সামরিক শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নিরাপত্তা মানে কেবল অস্ত্র বা সেনাবাহিনীর সক্ষমতা নয়: বরং একটি সচেতন, দক্ষ, সংগঠিত ও দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজও জাতীয় প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই বাস্তবতায় বিএনসিসিকে শুধু একটি সহশিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটিকে জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন, যুব নেতৃত্ব বিকাশ এবং দ্বিতীয় সারির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গঠনের একটি কৌশলগত প্ল্যাটফরম হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ বিএনসিসির মূল শক্তি হলো-এটি তরলদের মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, আত্মত্মবিশ্বাস, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেম গড়ে তুলতে সক্ষম।

বিশ্বের অনেক দেশ ইতিমধ্যেই যুবসমাজকে জাতীয় নিরাপত্তা ও নাগরিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ভারতের ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (NCC), সিংগাপুরের ন্যাশনাল ক্যাডেট কাঠামো বিধবা দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি-সব ক্ষেত্রেই তরুণদের মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও জাতীয় দায়িত্ববোধ গড়ে তোলাকে কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশেও বিএনসিসিকে সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে পুনর্গঠন করা সময়ের দাবি।
বিএনসিসির অন্যতম বড় সম্ভাবনা হলো-জাতীয় একা ও সামাজিক সংহতি শক্তিশালী করা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, শ্রেণি, ধর্ম ও সামাজিক পটভূমি থেকে আসা তরুণরা একসঙ্গে প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহমর্মিতা গড়ে তোলে। এটি বিভাজনের পরিবর্তে জাতীয় পরিচয়কে শক্তিশালী করে। সামাজিক মেরুকরণ, অনলাইন বিভ্রান্তি ও তথ্য-অস্থিরতার এই সময়ে এ ধরনের সামাজিক সংহতি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে বিএনসিসি নেতৃত্ব বিকাশের একটি কার্যকর ক্ষেত্র। প্রশিক্ষণ, ক্যাম্প, দল পরিচালনা ও মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রমের মাধ্যমে তরুণরা বাস্তব নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা অর্জন করে। ভবিষ্যতে প্রশাসন, রাজনীতি, শিক্ষা, সামরিক ও বেসামরিক বিভিন্ন খাতে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব গড়ে তুলতে এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষত এমন এক সময়ে, যখন তরুণদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়ছে, তখন তাদের মধ্যে নৈতিক নেতৃত্ব,
সহনশীলতা, শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রচিন্তা গড়ে তোলা অত্যন্ত সমর।

জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বিএনসিসির সম্ভাবনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, সামাজিক অস্থিরতা কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশিক্ষিত ক্যাডেটরা সহায়ক শক্তি হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড বা দুর্ঘটনায় উদ্ধারকাজ, প্রাথমিক চিকিৎসা, ত্রাণ বিতরণ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে বিএনসিসির সম্পৃক্ততা ইতিমধ্যে ইতিবাচক নজির তৈরি করেছে। পরিকল্পিতভাবে দক্ষতা বৃদ্ধি করা গেলে ভবিষ্যতে তারা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সিভিল ডিফেন্স কাঠামোর একটি শক্তিশালী অংশে পরিণত হতে পারে।

বর্তমান বিশ্বের নতুন বাস্তবতা হলো সাইবার ও তথ্যযুদ্ধ। রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচার, গুজব, ভুয়া তথ্য ও ডিজিটাল উগ্রবাদ এখন জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তিতে দক্ষ তরুণদের সম্পৃক্ত করে বিএনসিসির মাধ্যমে সাইবার সচেতনতা, তথ্য যাচাই, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সহায়তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ চালু করা যেতে পারে। এতে একদিকে যেমন দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে, অন্যদিকে সামাজিক প্রতিরোধ সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে।

তবে বিএনসিসির সম্ভাবনাকে কার্যকর শক্তিতে রূপ দিতে হলে কিছু মৌলিক সংস্কার জরুরি। প্রথমত, এটিকে আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজ বা সীমিত প্রশিক্ষণনির্ভর কাঠামো থেকে বের করে আধুনিক ও যুগোপযোগী কর্মসূচিতে রূ পান্তর করতে হবে। নেতৃত্ব উন্নয়ন, সাইবার নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, মানসিক সহনশীলতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সামাজিক যোগাযোগ ও নাগরিক দায়িত্ববোধকে প্রশিক্ষণের মূল অংশ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্ববধানে বিএনসিসির জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত র পরেখা প্রণয়ন জরুরি। সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ সুবিধা, ফিল্ড এক্সারসাইজ, শৃঙ্খলাকাঠামো ও পেশাদার দক্ষতা বিএনসিসির কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে মেধাবী ও যোগ্য ক্যাডেটদের সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি সেবায় অগ্রাধিকারভিত্তিক সুযোগ প্রদান করলে তরুণদের মধ্যে আগ্রহ ও প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে।

তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক বিএনসিসি কার্যক্রমকে আরো বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে। শহরের পাশাপাশি গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে, কারণ আধুনিক জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থায় নারী নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-বিএনসিসিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার ও জাতীয় স্বর্থকেন্দ্রিক একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা। প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সাংবিধানিক মূল্যবোধ, নাগরিক দায়িত্ববোধ ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কারণ শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভিত্তি কেবল সামরিক শক্তি নয়; বরং সচেতন, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজ।

বাংলাদেশ আজ একটি পরিবর্তনশীল সময় অতিক্রম করছে। দেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ-এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। এই যুবশক্তিকে সঠিক দিকনির্দেশনা, শৃঙ্খলা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তুলতে পারলে তারা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে। বিএনসিসি সেই রূপান্তরের একটি কার্যকর প্ল্যাটফরম হতে পারে, যদি রাষ্ট্র সময়োপযোগী পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পেশাদার বাস্তবায়নের মাধ্যমে এর পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক