প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের সকল মানুষের জীবন জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। প্রকৃতি প্রতিনিয়তই বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক সম্পদ উত্পাদন করে চলেছে। কিন্তু আমরা কি জানি এই পৃথিবী পুরো বছরের জন্য বিশ্বজুড়ে যে প্রাকৃতিক সম্পদ উত্পাদন করছেন, তা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে বছরের সাত মাস শেষ হওয়ার আগেই! অর্থাত্ স্বাভাবিক ভাবে প্রকৃতিতে যে যে সম্পদ উত্পন্ন হওয়া সম্ভব সারা বছরে, তা খাতায়কলমে এই বছর শেষ হয়ে গেছে ২৯ জুলাই। গত ২০ বছরে কখনো এত আগে এগিয়ে আসেনি এই দিন। অর্থাত্ ৭ মাসেই খালি প্রকৃতির ভাণ্ডার। পরিভাষায় এই দিনটিকে বলা হয়—আর্থ ওভারশ্যুট ডে। গ্লোবাল ফুটপ্রিন্ট নেটওয়ার্কের সামপ্রতিক সমীক্ষা বলছে, এক বছর ধরে উত্পাদিত প্রকৃতির ভাণ্ডার ১৯৭৯ সাল নাগাদ শেষ হয়ে সময় লাগত ১০ মাস।
১৯৭৩ সাল থেকে হিসেব করা হচ্ছে ‘আর্থ ওভারশ্যুট ডে’, যে বছরে প্রথম বার প্রাকৃতিক সম্পদের উত্পাদনের হারকে পিছনে ফেলে দিয়েছিল তার খরচের হার। হিসেব বলছে, সেই বছরে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু করার পর ক্রমেই ক্যালেন্ডারের পাতা ধরে এগোতে থেকেছে এই সময়সীমা।
সব জেনেও যা আটকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করেনি বা করতে সক্ষম হয়নি কোনো দেশের প্রশাসনই। ১৯৭০ সালের আগে পরিবেশে যে সম্পদ তৈরি হত, তা মানুষ খরচ করার আগেই পুনরায় তৈরি করে ফেলত পৃথিবী। সমপ্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের গবেষকরা জানিয়েছে যে, প্রাকৃতিক সম্পদে উত্পাদনে আরো জোর না দিয়ে দেদারসে বনভূমি ধ্বংস করা, গ্লোবাল ওয়ার্মিং এবং এল নিনোর মারাত্মক ক্ষতিকারক প্রভাব এবং অস্বাভাবিক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রে সম্পদের পুনরুত্পাদনের সময়ের থেকে পৌণে দুই গুণ দ্রুত হারে তা খরচ করে ফেলছে মানুষ। গ্লোবাল ফুটপ্রিন্ট নেটওয়ার্কের সামপ্রতিক সমীক্ষা বলছে, গত দু’দশকে ক্রমে ক্রমে দু’মাস এগিয়ে এসেছে এই সময়সীমা।
সমীক্ষায় উদাহরণস্বরূপ দেখানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের চাহিদা জোগানের যা পরিস্থিতি এবং হার, তাতে এই তারতম্য আগামী দিনে বজায় থাকলে ৫টি পৃথিবী হলে তবে ভারসাম্য আসা সম্ভব। একই ভাবে অস্ট্রেলিয়ার হারে জোগান-খরচ হলে তার জন্য প্রয়োজন ৪.১টি পৃথিবী। গ্লোবাল ফুটপ্রিন্ট নেটওয়ার্কের কর্মকর্তা ম্যাথিস ওয়াকেরঙ্গল জানিয়েছেন, এটা মানবসভ্যতার অস্তিত্বের প্রশ্ন। আমাদের কাছে রয়েছে মাত্র একটি পৃথিবী, কিন্তু গড়ে প্রতি বছর ১.৭৫ গুণ পৃথিবীর সম্পদ ব্যবহার করলে আগামী দিনে তার মারাত্মক ক্ষতিকারক প্রভাব হতে চলেছে। তার মতে, এই বিষয়ে সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে রাজনৈতিক সব সীমানা ভুলে। কারণ, আমরা অতিরক্তি যে বর্জ্য এবং জঞ্জাল আমরা তৈরি করছি, তা পৃথিবীতে স্বাভাবিক ভাবে ধ্বংস হবে না এবং মানুষের অস্তিত্বের পক্ষে ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলবে, যদি উদ্যোগী হয়ে সেগুলো নষ্ট করে না ফেলা হয়। একই বিষয় খাটে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে। মাছ, মাংস এবং সবজি যে হারে উত্পাদন হওয়া সম্ভব, তাকে বাড়ানোর চেষ্টা না করেই দেদার খরচ করায় তা ফুরিয়ে যাচ্ছে দ্রুত, সময়ের অনেক আগেই। কোন দেশে কী হারে প্রাকৃতিক সম্পদ দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে, তারও একটি উদাহরণ দেওয়া হয়েছে সমীক্ষায়—যেখানে দেখা যাচ্ছে, জাপানে চাহিদা জোগানের থেকে এতটাই বেশি, যে ৭.৭টি জাপান থাকলে, তবে প্রাকৃতিক সম্পদের জোগান ও চাহিদায় ভারসাম্য আসত।
দেখা যাচ্ছে পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা যত বেশি বাড়ছে, যত বেশি উন্নত জীবনের দিকে ধাবিত হচ্ছে, ততই দ্রুত নিঃশেষ হচ্ছে প্রকৃতির ভাণ্ডার। এখন না হয় ১২ মাসের ভাণ্ডার ৭ মাসেই শেষ হয়ে যাচ্ছে, এমন সময় আসবে যখন ১২ মাসের ভাণ্ডার দুই তিন মাসেই শেষ হয়ে যাবে। তখন বাকি ৯-১০ মাস যে ভাবে জোড়াতালি দিয়ে চালাতে হবে তার প্রভাব পড়বে পুরো মানব জীবনের জীবনমানের ওপর। সুতরাং সময় থাকতেই সতর্ক হতে হবে বিশ্ববাসীকে।
n লেখক : শিক্ষক, সাংবাদিক