শতবর্ষে ডেভিড অ্যাটেনবরো

পরিবেশ-সচেতনতার এক বৈশ্বিক কণ্ঠ

এই প্রাচীন পরিবর্তিত পৃথিবীকে আমরা প্রতিদিন দেখি-এ আকাশের নীল, নদীর স্রোত, সবুজ বনভূমি আর প্রাণীদের ঘোরাফেরা। কিন্তু এই দেখা কি দেখা নাকি শুধু তাকিয়ে থাকা, নাকি কেবল চোখে ধরা পড়া একরৈখিক বাস্তবতা? যিনি আমাদের জানালেন, পৃথিবীকে শুধু দেখতে নয়, বুঝতে, অনুভব করতে ও ভালোবাসতে হবে-তিনি ডেভিড অ্যাটেনবারা। তার শতবর্ষপূর্তি শুধু একজন মানুষের জন্মদিন নয়; এটি এক দর্শনের, এক দায়িত্ববোধের ও এক যাপিত জীবনের আত্মসমালোচনার দিন।

গত ৮ মে তার বয়স ১০০ বছর পূর্ণ হয়েছে। শত বছরের এই জীবন যেন এক দীর্ঘ প্রামাণ্যচিত্র, যেখানে ঘনীভূত হয়েছে জিজ্ঞাসা, অধ্যবসায়, বেদনা, বিস্ময় এবং এক গভীর মানবিক দায়বদ্ধতার বোধের দৃশ্যকাব্যের সংগ্রহশালায়। ডেভিড অ্যাটেনবরোর জীবনের শুরুটা ছিল নিভৃত। অথচ গভীরভাবে অনুপ্রাণিত। তার বাবা ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসক। মা ছিলেন মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ এক নারী। এই পরিবারে বড় হয়ে ওঠা ডেভিড খুব অল্প বয়সেই প্রকৃতির প্রতি অদম্য কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে যান।

শিশু ডেভিড পাথর, জীবাশ্ম, ছোট প্রাণী সংগ্রহ করতেন। পৃথিবীর রহস্য যেন তার কাছে এক অনাবিষ্কৃত জাদুঘরের মানচিত্র, যেখানে তিনি খুঁজে পান নতুন আনন্দ, নতন প্রশ্ন ও উত্তর। তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যাচারাল সায়েন্সে পড়াশোনা করেন। বিজ্ঞান তার কাছে শুধু পেশা নয়, এটি ছিল পৃথিবীকে বোঝার একটি ভাষা। শিক্ষাজীবনে তিনি শিখেছিলেন পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং প্রশ্ন করার সাহস। এই গুণগুলোই পরবর্তীকালে তাকে বিশ্বজয়ী ডকুমেন্টারি নির্মাতা হিসেবে গড়ে তোলে। কণ্ঠে ধারণ করেন গল্প বলার জাদু।Thumbnail Toshif Hasan (1)

ডেভিড অ্যাটেনবরোর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় বিবিসি টেলিভিশনের সঙ্গে। প্রথম দিকে তিনি ক্যামেরার সামনের লোক ছিলেন না, তিনি পর্দার পেছনে ১৯৫২ সালে ট্রেনি প্রযোজক হয়ে কাজ শুরু করেন। কিন্তু তার জ্ঞান, উপস্থাপনা এবং গল্প বলার জাদুকরি ক্ষমতা তাকে সামনে নিয়ে আসে। Zoo Quest' অনুষ্ঠান তাকে বিশ্বদরবারে পরিচিত। করে তোলে। সেখান থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ অভিযাত্রা-বনজঙ্গল, মরুভূমি, সমুদ্র, পর্বত-দেখা পৃথিবীর অদেখা প্রান্তে।

ডেভিড অ্যাটেনবরোর সাফল্য কোনো সহজলভ্য বিষয় ছিল না। এটি অর্জিত হয়েছে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, অনিশ্চয়তা এবং কল্পিত সাফল্যের পথে বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কাজ করার সাহস থেকে। দূরবর্তী অরণ্যে শুটিং, বিপজ্জনক প্রাণীর সংস্পর্শ এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় সবকিছুর মধ্যেও তিনি তার কাজ চালিয়ে গেছেন। তার জন্য এটি কেবল পেশা নয়-একটি দায়িত্ব। অ্যাটেনবরোর কাজের পেছনে রয়েছে কালজয়ী এক বিশাল দক্ষ টিম। ক্যামেরাপারসন, গবেষক, সম্পাদক, প্রযোজক-সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছে তার বিখ্যাত সব ডকুমেন্টারি ফিল্ম। তিনি সব সময় তার সহকর্মীদের কৃতিত্বের আসনে নিয়ে আসেন। তার মতে, প্রকৃতির গল্প বলা এককভাবে সম্ভব নয়, এটি একটি সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়াস।

"Planet Earth', 'Blue Planet, Life on Earth'-এই ডকুমেন্টারিগুলো শুধু টেলিভিশন অনুষ্ঠান নয়; এগুলো মানবজাতির জন্য এক অমূল্য সম্পদ, ইতিহাসের আয়নাঘর। তিনি প্রকৃতিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যা আগে কেউ এভাবে করেননি। তার কণ্ঠ, তার ভাষা, তার দৃষ্টিভঙ্গি-সবকিছু মিলিয়ে তিনি প্রকৃতির গল্পকে জাদুকরিভাবে প্রাণবন্ত করে তুলে নিয়ে আসেন অবাক করা নব দৃষ্টিভঙ্গিতে। অ্যাটেনবরোর দর্শন অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি বলেন-মানুষ প্রকৃতির অংশ, প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণকর্তা নয়। তিনি বারবার বলেছেন, 'আমরা যদি প্রকৃতিকে ধ্বংস করি, তাহলে শেষ পর্যন্ত আমরা নিজেদেরই ধ্বংস করব।'

জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের পতনও বন উজাড়-এই বিষয়গুলো নিয়ে অ্যাটেনবরো অত্যন্ত সরব। তিনি শুধু তথ্য দেন না; তিনি আমাদের বিবেককে নাড়া দেন। তার বক্তব্যে রয়েছে যুক্তি-বিজ্ঞান কিন্তু তার সঙ্গে রয়েছে গভীর মানবিক আবেদন। তিনি আমাদের একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছেন, পৃথিবীকে কেবল সম্পদ হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে দেখার। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন প্রতিটি প্রাণী, গাছ ও নদীর আলাদা-আলাদা একটি গল্প আছে এবং সেই গল্প আমাদের সবার জীবনের সঙ্গে জড়িত।Thumbnail Toshif Hasan (3)

অ্যাটেনবরোর উপস্থাপনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার আবেগ। তিনি কেবল তথ্য দেন না; তিনি আমাদের অনুভব করান। একটি পাখির পাখা মেলা, একটি প্রাণীর সংগ্রাম বা একটি বনভূমির নীরবতা-সবকিছু তিনি এমনভাবে তুলে ধরেন, যা মানবদর্শকের হৃদয়ে গভীর ছাপ রেখে যায়।

শত বছর পূর্ণ করা শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি দীর্ঘ এক অদেখা বিশ্বকে পরিভ্রমণের প্রমাণ। এই শত বছরে অ্যাটেনবরো যা করেছেন, তা শুধু তার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়-এটি মানবজাতির জন্য এক দিকনির্দেশনার দলিল। তার জীবন আমাদের শেখায় কৌতূহল হারিয়ে ফেলো না, প্রকৃতিকে ভালোবাসো, দায়িত্ব এড়িয়ে যেয়ো না এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-পৃথিবীকে রক্ষা করো। তার জীবন, কাজ, দর্শন আমাদের একটি পথ দেখায়। সেই পথ অনুসরণ করা আমাদের দায়িত্ব। তিনি বিজ্ঞান ও দর্শনের পথ দেখান-পৃথিবী আমাদের নয়-আমরা পৃথিবীর। এই উপলব্ধিই হতে পারে তার শতবর্ষের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

লেখক: ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকার, এক্সিকিউটিভডিরেক্টর, ক্রিয়েটিভ উইংস, বাংলাদেশ