একটি দেশের সাধারণ মানুষ খুব বেশি কিছু চাহে না। তাহারা রাষ্ট্রবিজ্ঞান বুঝে না, কূটনীতির জটিল হিসাবও বুঝে না। মাথাপিছু আয় কত বাড়িল, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কত হইল—ইহাও অধিকাংশ মানুষের দৈনন্দিন ভাবনার বিষয় নহে। মানুষ আসলে একটি জিনিসই চাহে—সে যেন ভয়হীন পরিবেশে বাঁচিতে পারে। তাহার সন্তান নিরাপদে বিদ্যালয়ে যাইবে, সে নিজের মত প্রকাশ করিতে পারিবে এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাহাকে অপমান বা হেনস্তার শিকার হইতে হইবে না—স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ সাধারণ মানুষের কাছে এইটুকুই।
কিন্তু দুঃখজনক সত্য হইল, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও অধিক সময় অতিক্রান্ত হইলেও আমরা এখনো সেই মানসিক নিরাপত্তার রাষ্ট্র গড়িয়া তুলিতে পারি নাই। ক্ষমতার পালাবদল ঘটিয়াছে বহু বার, রাজনৈতিক স্লোগান বদলাইয়াছে; কিন্তু ভয় দেখাইবার সংস্কৃতি যেন একইভাবে প্রবহমান রহিয়াছে। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য এইখানেই যে, আমরা একই ভাষার মানুষ হইয়াও পরস্পরকে সহ্য করিবার ক্ষমতা ক্রমশ হারাইয়া ফেলিতেছি। রাজনৈতিক বিভাজন এখন কেবল রাজনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নাই, ইহা সামাজিক সম্পর্কেও প্রবেশ করিয়াছে। মতের ভিন্নতা এখন অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত শত্রুতার রূপ ধারণ করিতেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুলিলেই দেখা যায়—মানুষ যেন যুক্তি অপেক্ষা অপমান করিতেই অধিক আগ্রহী। অন্যের সাফল্যে আনন্দিত হওয়া দূরের কথা, বরং কাহাকে কীভাবে টানিয়া নামানো যায়, তাহাই যেন এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা।
অথচ এই দেশটির যাত্রাপথ এত কঠিন হইবার কথা ছিল না। এই মাটি উর্বর, এই দেশের মানুষ পরিশ্রমী এবং আমাদের ইতিহাসে সম্মিলিত সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতি রহিয়াছে। ভাষা আন্দোলন হইতে মুক্তিযুদ্ধ—বাংলাদেশের জন্মই হইয়াছে ঐক্য ও আত্মত্যাগের ভিতের উপর দাঁড়াইয়া; কিন্তু স্বাধীনতার পরে আমরা ধীরে ধীরে এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে প্রবেশ করিলাম, যেইখানে অবিশ্বাসই প্রধান শক্তিতে পরিণত হইল। প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করিবার আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় রাষ্ট্র গঠনের দায়িত্বকেও ছাপাইয়া দেয়। রাষ্ট্র কেবল সেতু, ফ্লাইওভার ও অট্টালিকার সমষ্টি নহে। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি মানুষের মনের ভিতরে বাস করে। মানুষ যদি সর্বক্ষণ আতঙ্কে থাকে, যদি সে অনুভব করে—আজকের প্রশংসা কাল তাহার বিপদের কারণ হইতে পারে, তবে বাহ্যিক উন্নয়ন দিয়াও স্থায়ী স্থিতি আসে না। ভয় ও অনিশ্চয়তা মানুষের সৃজনশীলতাকে নষ্ট করে, সমাজকে বিভক্ত করে এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেও দুর্বল করিয়া ফেলে।
পৃথিবীর ইতিহাসে বহু দেশ ভয়াবহ বিভাজনের মধ্য দিয়া গিয়াছে। দক্ষিণ আফ্রিকা বর্ণবিদ্বেষের আগুনে পুড়িয়াছে, রুয়ান্ডা গণহত্যার বিভীষিকা দেখিয়াছে, স্পেন দীর্ঘ স্বৈরশাসনের ক্ষত বহন করিয়াছে; কিন্তু সেই সকল দেশ একসময় এমন নেতৃত্ব পাইয়াছে, যাহারা প্রতিহিংসাকে স্থায়ী নীতি বানান নাই। নেলসন ম্যান্ডেলা বুঝিয়াছিলেন—একটি জাতিকে চিরকাল প্রতিশোধের উপর দাঁড় করাইয়া রাখা যায় না। রাষ্ট্রনায়ক তাহারাই, যাহারা নিজেদের দল বা গোষ্ঠীর সীমা অতিক্রম করিয়া জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন। বাংলাদেশের আজ সেইরূপ নেতৃত্বের প্রয়োজন—যাহারা মানুষকে ভয় দেখাইয়া নহে, আস্থা দিয়া নেতৃত্ব দিবেন। যাহারা বুঝিবেন, বিরোধী মতকে নিশ্চিহ্ন করা গণতন্ত্রের শক্তি নহে—বরং সহনশীলতা ও ন্যায়বোধই রাষ্ট্রকে দীর্ঘস্থায়ী করে।
সবচাইতে বড় কথা, আমাদের নিজেদেরও পরিবর্তিত হইতে হইবে। সমাজে যদি সহনশীলতা না থাকে, যদি আমরা নিজেরাই পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি, তাহা হইলে কোনো নেতৃত্বই স্থায়ী সমাধান আনিতে পারিবে না। একটি জাতি তখনই সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হয়, যখন সেই জাতির মানুষ নিরাপদে কথা বলিতে পারে, ভিন্নমত পোষণ করিয়াও সম্মানের সহিত বাঁচিতে পারে এবং ভবিষ্যৎ লইয়া আতঙ্কিত না হইয়া আশাবাদী হইতে পারে। বাংলাদেশের মানুষ এখনও সেই স্বপ্ন দেখিবার আশা হৃদয়ে ধারণ করিতে চাহে। কারণ আশাহীন জাতি বাঁচে না।