মানবিকতার এক অনন্য নিদর্শনস্বরূপ বাংলাদেশের ভূমিহীন ও গৃহহীন জনগোষ্ঠীর জন্য ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প' গ্রহণ করা হয়। আশ্রয়ণকে অধিকার হিসাবে বিবেচনা করিয়া সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের মাথার ওপর ছাদ নিশ্চিত করিবার যে মহান ব্রত গ্রহণ করা হয়, তাহা আজ কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল ও স্থানীয় প্রশাসনের একাংশের গাফিলতিতে কলঙ্কিত হইতেছে। সম্প্রতি নওগাঁর রাণীনগর উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর লইয়া বেচাকেনার যে রমরমা বাণিজ্যের সংবাদ প্রকাশিত হইয়াছে, তাহা দুঃখজনক। ইহা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
জানা যায়, রাণীনগরের মালিপুকুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরগুলি অর্থের বিনিময়ে হাতবদল হইতেছে। কোথাও ৭০ হাজার, কোথাও ১ লক্ষ ১০ হাজার, এমনকি বিলাসবহুলভাবে সজ্জিত ঘর ৩ লক্ষ টাকায় বিক্রয়ের প্রস্তাবও আসিতেছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, যাহাদের নামে এই সকল ঘর বরাদ্দ করা হইয়াছে, তাহাদের অনেকেরই নিজস্ব জমিজমা রহিয়াছে অথবা তাহারা সচ্ছল। অথচ প্রকৃত ভূমিহীন যাহারা রৌদ্র-বৃষ্টি মাথায় লইয়া দিনাতিপাত করে, তাহারা এই অধিকার হইতে বঞ্চিত। সরকারি বিধিমোতাবেক এই ঘরগুলি বিক্রয়যোগ্য নহে, তবু স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়া দলিল করিয়া ঘর দখল ও বিক্রয়ের যে ‘মহোৎসব' চলিতেছে, তাহা স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির অভাবকেই স্পষ্ট করিয়া তোলে। নূতন সরকারের উচিত এই ব্যাপারে দৃষ্টি দেওয়া এবং প্রকৃত গৃহহীন ও ছিন্নমূল মানুষ যাহাতে সরকারি ঘর পায়, সেই ব্যাপারে নূতন উদ্যোগ গ্রহণ করা।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের এই দুর্দশার পশ্চাতে রহিয়াছে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ। প্রথমত, উপকারভোগী নির্বাচনে চরম স্বচ্ছতার অভাব রহিয়াছে। ইহার পূর্বে সচ্ছল ব্যক্তিরা প্রভাব খাটাইয়া কিংবা অনৈতিক উপায়ে ঘর বাগাইয়া লইয়াছে, অথচ প্রকৃতপক্ষে যাহারা নিঃস্ব, তাহাদের নাম তালিকায় উঠে নাই। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় রাজনীতি ও অসাধু চক্রের যোগসাজশ বিদ্যমান। দেখা গিয়াছে, প্রকল্পের দায়িত্বরত ব্যক্তিরাই ঘর বিক্রয়ের মধ্যস্থতা করিয়াছেন। তৃতীয়ত, দূরবর্তী এলাকার অধিবাসীদের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হইয়াছে। ঘরের মায়া বা প্রয়োজন না থাকায় তাহারা ঘর পাইয়া তাহা বিক্রয় করিয়া প্রস্থান করিতেছে। এমন ঘটনা অপ্রত্যাশিত ও অগ্রহণযোগ্য।
এই পরিস্থিতির উত্তরণে ও আশ্রয়ণ প্রকল্পের সদ্ব্যবহার নিশ্চিতকরণে কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাইতে পারে। যেমন—নওগাঁসহ সমগ্র দেশে যেইখানেই ঘর বিক্রয়ের অভিযোগ উঠিয়াছে, সেইখানে দ্রুত উচ্চতর প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি গঠন করিতে হইবে। যাহারা অবৈধভাবে ঘর ক্রয় করিয়াছেন এবং যাহারা বিক্রয় করিয়াছেন, তাহাদের উভয়ের বরাদ্দ বাতিল করিয়া ঘরগুলি খাস খতিয়ানভুক্ত করিতে হইবে। দ্বিতীয়ত, প্রকৃত ভূমিহীন যাচাই করিতে হইবে। ডাটাবেজ তৈরির মাধ্যমে প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের তালিকা প্রস্তুত করা কঠিন কিছু নহে। স্থানীয় প্রভাবশালী বা আত্মীয়করণের ঊর্ধ্বে উঠিয়া স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ঘর বণ্টন নিশ্চিত করিতে হইবে। বাড়াইতে হইবে নিয়মিত তদারকি। উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প কমিটিকে কেবল ঘর হস্তান্তর করিয়াই দায়িত্ব শেষ করিলে চলিবে না। ঘরগুলিতে প্রকৃত বরাদ্দপ্রাপ্তরা বসবাস করিতেছেন কি না, তাহা প্রতি মাসে সরেজমিন পরিদর্শন করিতে হইবে। সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ ও অবৈধ হস্তান্তরের সহিত জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে, যাহাতে ভবিষ্যতে কেহ এমন পথে পা বাড়াইতে না পারে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর কেবল অসচ্ছল ও হতদরিদ্র লোকদের বসবাসের জন্যই বরাদ্দ রাখিতে হইবে। আশ্রয়ণ প্রকল্প কেবল ইট-সিমেন্টের কাঠামো নহে, ইহা লক্ষ লক্ষ মানুষের বাঁচিয়া থাকিবার স্বপ্ন। এই স্বপ্নে যাহারা দুর্নীতির কালো ছায়া বিস্তার করিতেছে, তাহাদের অবশ্যই প্রতিরোধ করিতে হইবে। সরকারের উচিত অবিলম্বে এই ছিদ্রপথগুলি বন্ধ করিয়া প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য রক্ষা করা।